ঘোষণা

অনন্য প্রতিভাবান নজরুল

শুভ্রা সাহা | সোমবার, ৩১ আগস্ট ২০২০ | পড়া হয়েছে 95 বার

অনন্য প্রতিভাবান নজরুল

বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম যার গান ও কবিতা যুগে যুগে বাঙালি জীবন সংগ্রাম ও স্বাধীনতা সংগ্রামে প্রেরণার উৎস হয়ে কাজ করেছে, তাঁর চুয়াল্লিশ তম প্রয়াণ দিবসে শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন করছি। নজরুল প্রতিভা দিকে দিকে অবারিত ধারায় ধাবিত হয়ে নতুন নতুন প্রতিভার স্ফুরন ঘটছে। নতুন প্রজন্ম নজরুলের পদাঙ্ক অনুসরণ করে তাদের প্রতিভাকে উদ্ভাসিত করে তুলছে।

বিবিসি বাংলা নজরুলকে শ্রেষ্ঠ বাঙালি রূপে চিহ্নিত করেছে। ত্রিশ দিনের এক জরিপে দেশের কুড়ি জন শ্রেষ্ঠ বাঙালিকে তারা চিহ্নিত করে। এরমধ্যে তৃতীয় স্থানে রয়েছেন অসাম্প্রদায়িক মানবতার কবি কাজী নজরুল ইসলাম। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ তাঁকে সরস্বতীর বরপুত্র বলে আখ্যা দিয়েছেন। তাঁর বর্ণময় জীবন ছিল নানা জানা অজানা ঘটনায় সম্বৃদ্ধ। আজ তার প্রয়াণ দিবসে আমি এর মধ্যে দু চারটি উল্লেখ করছি।

একবার আলি আকবর নজরুল ইসলামকে একটি পান্ডুলিপি দিয়ে বললেন এটি পড়ে জানাতে কেমন হয়েছে। নজরুল ইসলাম পুরো পান্ডুলিপিটি পরে বললেন, আপনার পাণ্ডুলিপির ছড়াগুলো ছোটদের উপযোগী হয়নি। যদি বলেন আমি একটা ছড়া লিখে দেখাতে পারি। সঙ্গে সঙ্গে সঙ্গে আলি আকবর খুশি হয়ে তাঁকে ছড়া লিখতে বললেন। নজরুলও খুশি হয়ে দুই খিলি পান মুখে গুঁজে, কিছুক্ষণের মধ্যেই ‘ লিচু চোর ‘ ছড়াটি লিখে ফেললেন। এমনি তাঁর অবাক করা প্রতিভা ছিল।

একদিন তিনি বারান্দায় বসে আছেন, হঠাৎ তার নজরে পড়লো উঠোনের এক কোনায় পেয়ারা গাছের নিচে দাঁড়িয়ে অঞ্জলি ঠোঁট উল্টে হাত-পা নেড়ে কাকুতি মিনতি করে কার কাছে যেন পেয়ারা চাইছে । নজরুল ভাবলেন না দিলে তিনি নিজে তাকে পেয়ারা পেরে দেবেন। তখন নজরুল উঠে অঞ্জলি সামনে গেলেন কিন্তু কাউকে দেখতে পেলেন না। অঞ্জলিকে জিজ্ঞেস করলেন তুমি কার সাথে কথা বলছিলে? অঞ্জলি বলে, কাকাবাবু ওই দেখো গাছে দুষ্টু কাঠবিড়ালি। রোজ রোজ পেয়ারা খেয়ে পালিয়ে যায়। আমাকে একটাও দেয় না। কবি এই ঘটনাটিকে চিরস্থায়ী করে রাখার জন্য, সেই মুহূর্তেই ‘খুকু ও কাঠবিড়ালী’ কবিতাটি লিখে ফেলেন।

ছোট বেলায় নজরুল আসানসোলে রুটির দোকানে কাজ করতেন। নিজের পরিশ্রম লাঘব করার জন্য, তিনি রুটি বানাতে বানাতে মুখে মুখে ছড়া তৈরি করতেন। এতে তার শত পরিশ্রম কে পরিশ্রম বলে মনে হতো না। একদিকে নজরুল আটা মাখছেন । অন্যদিকে তার গা দিয়ে টপটপ করে ঘাম ঝরে পড়ছে। আর মুখে মুখে ছড়া কাটছেন—” মাখতে মাখতে গমের আটা, ঘামে ভিজলো আমার গা টা।”

একবার সংগীত শিল্পী আব্বাস উদ্দিন একটি নতুন গজল লিখে দেওয়ার জন্য , নজরুলকে অনেক খোঁজাখুঁজি করে, কোথাও খুঁজে না পেয়ে তার বাড়িতে গিয়ে দেখেন নজরুল গভীর মনোযোগ দিয়ে কি যেন লিখে চলছেন। আব্বাস উদ্দিন কে হাতের ইশারায় বসতে বলে আবার লেখায় মনোযোগ দেন। আব্বাস উদ্দিন অনেকক্ষণ বসে থাকার পর তার জোহরের নামাজ পড়ার সময় হলে, তিনি উসখুস করতে থাকেন। নজরুলের তা দৃষ্টি এড়ায় না । তিনি বলেন- “কি তাড়া আছে? যেতে হবে ? ” আব্বাসউদ্দীন বললেন- “ঠিক তাড়া নেই , তবে আমার জোহরের নামাজ পড়তে হবে । আর আপনার কাছে এসছি একটা ইসলামি গজল নেবার জন্য ।”

‘নামাজ পড়ার কথা শুনে নজরুল তাড়াতাড়ি একটি পরিষ্কার চাদর আলমারি থেকে বের করে বিছিয়ে দিলেন । আব্বাস উদ্দিনও তাড়াতাড়ি নামাজ পড়তে বসে গেলেন। নামাজ পড়া শেষ হওয়ার সাথে সাথে নজরুল তার হাতে একটি কাগজ ধরিয়ে দিয়ে বললেন -” এই নাও তোমার গজল ।” নামাজ পড়তে যে সময় লেগেছে ঠিক সেই সময়ের মধ্যে নজরুল একটি নতুন গজল লিখে ফেললেন। সেই গজলটি ছিল- ” হে নামাজী আমার ঘরে নামাজ পড় আজ। দিলাম তোমার চরণ তলে হৃদয় জায় নামাজ ।”

কাজী নজরুল ইসলাম ‘ধূমকেতু’ পত্রিকা সম্পাদনা করতেন। ধুমকেতু অফিসে সব সময় চলত হাসি আনন্দের বন্যা। মাটির ভাঁড়ে চা চলত কিছুক্ষণ পরপর । কবি যখনই চায়ে চুমুক দিতেন , বা কোন রসিক বন্ধু ঘরে ঢুকলে, বা অন্য কোন হাসির কথা মনে পড়লে, তখনই কবি অট্ট হাস্য করে উঠতেন, মাটির পেয়ালা ছুড়ে মারতেন, আর মুখে বলতেন -‘ দে গরুর গা ধুইয়ে—-‘!

বিংশ শতাব্দীর বাংলা মননে কাজী নজরুল ইসলামের মর্যাদা ও গুরুত্ব অপরিসীম। একাধারে তিনি কবি ,সাহিত্যিক ,সঙ্গীতজ্ঞ , সাংবাদিক, সম্পাদক, রাজনীতিবিদ এবং সৈনিক হিসাবে অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে সর্বদাই ছিলেন সোচ্চার এবং অনন্য প্রতিভার অধিকারী সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বাঙালি।

Facebook Comments

বাংলাদেশ সময়: ৮:১৫ অপরাহ্ণ | সোমবার, ৩১ আগস্ট ২০২০

জাপানের প্রথম অনলাইন বাংলা পত্রিকা |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত