ঘোষণা

বিদেশ–ফেরত জনশক্তি নিয়ে বাংলাদেশ কী করবে?

নুসরাতে আজিজ | রবিবার, ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২০ | পড়া হয়েছে 67 বার

বিদেশ–ফেরত জনশক্তি নিয়ে বাংলাদেশ কী করবে?

ইউনাইটেড নেশনস পপুলেশন ডিভিশন এর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী প্রবাসী জনশক্তির সংখ্যা বিবেচনায় ইন্ডিয়া, মেক্সিকো, চীন, রাশিয়া এবং সিরিয়ার পরই বাংলাদেশের অবস্থান। বাংলাদেশের প্রায় ৮০ লাখ প্রবাসীর মধ্যে অর্ধেকের বেশি কাজ করে জিসিসি. (সৌদি আরব, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, বাহরাইন এবং ওমান) দেশগুলোতে। বিশ্বের অন্য দেশগুলোর মধ্যে মালয়েশিয়া এবং সিঙ্গাপুর বাংলাদেশি শ্রমিকের বড় গন্তব্যস্থল।

বিদেশে বাংলাদেশি শ্রমিকের সংখ্যা বিবেচনায় সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, এবং ওমানের পরেই মালয়েশিয়া, কাতার এবং সিঙ্গাপুরের অবস্থান। করোনা ভাইরাসের কারণে সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ার অর্থনীতিতে বড় ধরনের কোনো পরিবর্তন না হলেও জিসিসি দেশগুলোতে হয়েছে। গালফ লেবার মার্কেটস অ্যান্ড মাইগ্রেশনের তথ্য অনুযায়ী মধ্যপ্রাচ্যের এই দেশগুলোতে ৪২ লাখেরও বেশি বাংলাদেশি কাজ করে।

এর মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি বাংলাদেশি সৌদি আরবে কাজ করেন। এদের অধিকাংশই অদক্ষ শ্রমিক যারা একটা নির্দিষ্ট সময়ের চুক্তিতে সেখানে কাজ করতে গিয়েছে। পুরোনো চুক্তি শেষে আবার নতুন চুক্তি হবে কিনা তা নির্ভর করে কোম্পানির আয় বা মুনাফার ওপর। আবার কোম্পানির মুনাফা নির্ভর করে দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ওপর। সৌদি অর্থনীতির মূল আয় আসে পেট্রোলিয়াম শিল্প থেকে যা জিডিপির প্রায় ৪২ ভাগ। দেশটি পর্যটন শিল্পে বছরে প্রায় ২৭ বিলিয়ন ইউএসডলার (২০১৯ সালের তথ্য অনুসারে) আয় করে। দুটো শিল্পই এখন হুমকির সম্মুখীন।

করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে ব্যাহত উৎপাদন ব্যবস্থা, ব্যবসা-বাণিজ্য, বিমান চলাচল, পর্যটন ও বিনোদন শিল্পে জ্বালানির চাহিদা কমে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ৬৮ ডলার থেকে ৪২-৪৪ ডলারে নেমে গেছে যা ভবিষ্যতে আরও কমতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। ১৯৮৫ সালে তেলের দাম পতনের পর সৌদি আরবে এশিয়ান দেশগুলো থেকে মাইগ্রেশন অনেক কমে গিয়েছিল। ১৯৯৭-৯৮ সালেও একই ধরনের ঘটনা ঘটেছিল। সংকট দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার কারণে এবারের প্রবাসী শ্রমিকের ছাঁটাই হার পূর্বের সংকট কালীন সময়ের তুলনায় অনেক বেশি হতে পারে।

তা ছাড়া ইন্টারন্যাশনাল মনিটারি ফান্ড (আইএমএফ) এর ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী ২০২০ সালে সৌদি আরবের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ঋণাত্মক (-২.৩ %) হবে। ফলে সৌদি অর্থনীতি বেশ খারাপের দিকেই যাচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের সবগুলো তেল নির্ভর দেশের চিত্র কমবেশি একই রকমের। এর কুফল বাংলাদেশ, ইন্ডিয়া, পাকিস্তান, মিশরসহ অনেক দেশকে বহন করতে হবে।

ভবিষ্যতে মালয়েশিয়া এবং সিঙ্গাপুর আগের মতোই শ্রমিকের চাহিদা থাকবে। অস্ট্রেলিয়া, ইউরোপ, আমেরিকা, জাপান এবং কানাডাতে ইমিগ্রেশন চালু থাকলেও তারা অদক্ষ শ্রমিক আমদানি করবে না। তাহলে বাংলাদেশের উপায় কী?

বাংলাদেশের প্রবাসী শ্রমিকদের মধ্যে অধিকাংশই এই তেল নির্ভর দেশগুলোতে কাজ করে বলে বিশেষ করে বাংলাদেশ অর্থনীতির জন্য একটি অত্যন্ত খারাপ খবর। তা ছাড়া, প্যারিস চুক্তি ২০১৬, যেখানে সৌদি আরবসহ বিশ্বের ১৯৬টি দেশ সাক্ষর করেছে, তাতে বিশ্ব তাপমাত্রা বৃদ্ধিকে ১.৫% এর ওপরে যেতে না দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা স্থির করা হয়েছে। এক গবেষণায় দেখা গিয়েছে, যদি বিশ্বের তাপমাত্রা বৃদ্ধি ২% এ রাখতে হয় তবে বিশ্বের এক-তৃতীয়াংশ তেল, অর্ধেক গ্যাস এবং পাঁচ ভাগের চার ভাগ কয়লার মজুত মাটির নিচেই থেকে যাবে।

বিশ্বে যে হরে গ্রিন এনার্জিতে বিনিয়োগ করছে, তাতে হয়তো এক দশকের বেশি সময় লাগবে না যাতে ফসিল ফুয়েল এর উত্তম বিকল্প আবিষ্কার হয়ে যাবে। ফসিল ফুয়েল এর বিকল্প আবিষ্কার হলে বিশ্বের অধিকাংশ দেশ যারা প্যারিস চুক্তিতে সই করেছে তারা এই তেল, গ্যাস এবং কয়লার পরিবর্তে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার করবে। এতে যে দেশগুলো অর্থনৈতিক দিক থেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে এর মধ্যে সৌদি আরব অন্যতম। সৌদি রপ্তানি আয়ের সিংহভাগ যা তেল বিক্রি থেকে আসে তা আর আসবে না। এনার্জি পরাশক্তি নাম খ্যাত সৌদি আরব অর্থনীতিতে দুর্বল হয়ে পড়বে। সন্দেহাতীতভাবে, সৌদিতে শ্রমশক্তি জোগানদাতা-বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ভারত, মিশর সহ অন্যান্য গুলোতেও এর কম বেশি প্রভাব পড়বে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ইতিমধ্যে বাংলাদেশ প্রবাসীরা ফেরত আসা শুরু করে দিয়েছে। সরকারি হিসেব অনুযায়ী জানুয়ারি থেকে মার্চ এই তিন মাসে বাংলাদেশে প্রায় ২ লাখ প্রবাসী বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ফেরত গিয়েছে। যখন আবার বিমান চলাচল স্বাভাবিক হবে, নিঃসন্দেহে এই সংখ্যা আরও অনেক বেশি হবে। গত মে মাসে সৌদি আরবের বাংলাদেশ মিশন জানিয়েছে যে সৌদি থেকে ৩-৫ বছরে প্রায় ১০ লাখ বাংলাদেশি শ্রমিক ফেরত যেতে পারে। শুধু সৌদি আরব নয় মধ্যপ্রাচ্যের সব দেশ থেকে একটা বিশাল সংখ্যক প্রবাসী দেশে ফেরত যাবে।

বিএমইটি এর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালের মোট রেমিট্যান্স এর ৭৩ ভাগই জিসিসি দেশগুলো থেকে এসেছে। এই দুঃসময়ে বাংলাদেশ শুধু রেমিট্যান্সই হারাবে না, দেশের ওপর বিশাল এক বেকার জনগোষ্ঠীর বোঝাও চেপে বসবে। বাংলাদেশ এমনিতেই প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমার থেকে আসা প্রায় ১.১ মিলিয়ন রোহিঙ্গা শরণার্থী নিয়ে বিপদে আছে। আবার নতুন করে এক বিশাল সংখ্যক বিদেশ ফেরত বেকার নাগরিক নিয়ে কীভাবে দেশটি তার অর্থনীতি সামাল দেবে, তা এখনই নীতিনির্ধারদের ভাবতে হবে।

ভবিষ্যতে মালয়েশিয়া এবং সিঙ্গাপুর আগের মতোই শ্রমিকের চাহিদা থাকবে। অস্ট্রেলিয়া, ইউরোপ, আমেরিকা, জাপান এবং কানাডাতে ইমিগ্রেশন চালু থাকলেও তারা অদক্ষ শ্রমিক আমদানি করবে না। তাহলে বাংলাদেশের উপায় কী? প্রথমত, আমাদের নতুন নতুন শ্রম বাজার খুঁজতে হবে। দ্বিতীয়ত, ফেরত যাওয়া অদক্ষ শ্রমিকদের ট্রেনিং ব্যবস্থা করতে হবে যাতে তারা হয় স্বনির্ভর হতে পারে, নতুবা বর্তমান বিশ্বের শ্রম বাজারের চাহিদা অনুযায়ী প্রস্তুত হতে পারে।

একটি প্রস্তাব দিতে চাই। সরকারের প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় ‘প্রবাসী কর্মসংস্থান বিমা’ চালু করতে পারে যা আরও আগে করা হলে বর্তমানে বিদেশ ফেরত শ্রমিকদের বিপাকে পড়তে হতো না। বিমাটি হবে নিম্নরূপ যারা বিদেশে অস্থায়ী বা চুক্তিভিত্তিক চাকরিতে যাবেন তাদের বিদেশ গমনের শুরুতে একটি বিমা করতে হবে। প্রথমেই একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ (ডাউনপেমেন্ট) দিয়ে বিমা চালু হবে। এরপর বিদেশ গিয়ে চাকরিতে স্থিতিশীল হওয়ার পর (৬ মাস পর) থেকে প্রতি মাসে বা প্রতি চার মাসে একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ প্রিমিয়াম বাংলাদেশ মিশনে পাঠাবেন।

টাকার অঙ্ক ব্যক্তির আর্থিক সামর্থ্যের ওপর নির্ভর করবে। বিভিন্ন আকারের বিমা থাকবে। যিনি যে হারে বিমাতে টাকা রাখবেন তার বিমাও সেই আকারের হবে। এটি বিদেশ কল্যাণ মন্ত্রণালয় ব্যাংকের মাধ্যমে, বা সরাসরি বিনিয়োগ করবে। এরপর অন্যান্য বিমা যেভাবে কাজ করে এই বিমাও সেভাবে চলবে। যিনি (উদাহরণ স্বরূপ) পাঁচ বছরের চুক্তিতে গেলেন এবং পাঁচ বছর পর তাকে দেশে ফেরত যেতে হলো। তার ক্ষেত্রে তার বিমা সঞ্চয় হিসাবের মতো কাজ করবে। তিনি তার জমা টাকা এবং একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ সুদ/বিনিয়োগের লভ্যাংশ পাবেন।

আর যে প্রবাসীকে হঠাৎ করে নির্দিষ্ট সময়ের আগেই চাকরি হারাতে হলো অথবা অসুস্থতার কারণে বা কোনো দুর্ঘটনার কারণে আর চাকরি করতে পারল না, তাকে একেবারে নিঃস্ব হয়ে যেতে হবে না। কেউ যদি চুক্তির মেয়াদ শেষ না হওয়ার আগেই কোনো কারণে দেশে ফেরত যেতে হয়, তাকে বিমাতে উল্লেখিত পুরো অর্থ ফেরত দেওয়া হবে। এতে সরকার বিমার টাকা দিয়েই প্রবাসী শ্রমিকদের দুঃসময়ে তাদের পাশে দাঁড়াতে পারবে।

করোনা ভাইরাস মহামারির কারণে এ বছর এত প্রবাসী বাংলাদেশিকে দেশে ফেরত যেতে হচ্ছে। কিন্তু স্বাভাবিক অবস্থায় একসঙ্গে এত প্রবাসীকে দেশে ফেরত যেতে হবে না। ফলে এই বিমা টেকসই হবে।

ড. নুসরাতে আজীজ: সহযোগী অধ্যাপক, আলগমা বিশ্ববিদ্যালয়, কানাডা, সূত্র : প্রথম আলো

 

Facebook Comments

বাংলাদেশ সময়: ১:৫৫ অপরাহ্ণ | রবিবার, ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২০

জাপানের প্রথম অনলাইন বাংলা পত্রিকা |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত