ঘোষণা

মুনিয়া আত্মহত্যা করলেও মুনিয়ার প্রতি আমাদের দায় শেষ হয়ে যায় নি

মো. রহমত উল্লাহ্ | বৃহস্পতিবার, ২৯ এপ্রিল ২০২১ | পড়া হয়েছে 214 বার

মুনিয়া আত্মহত্যা করলেও মুনিয়ার প্রতি আমাদের দায় শেষ হয়ে যায় নি

মোসারাত জাহান মুনিয়া। বয়স ২২ বছর। দেখতে ফুলের মত। বাবা মৃত শফিকুর রহমান। বাড়ি কুমিল্লা সদরে। থাকতো গুলশানে। বাসা ভাড়া ১ লাখ টাকা। একাই থাকতো সে। পড়তো দ্বাদশ শ্রেণিতে। ফ্যানের সাথে ওড়না দিয়ে ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া যায় তার মৃতদেহ। ২৭ এপ্রিল ২০২১ তারিখে মামলা করেন তার বড় বোন। আসামি করেন বসুন্ধরার এমডি সায়েম সোবাহান আনভীরকে। যার বয়স ৪৪ বছর। এখন সবাই বলবো, বিচার চাই। হয়তো চিহ্নিত হবে খুনি। চিহ্নিত হবে আদেশ দাতা। বিচার হবে কোন একদিন। নয়তো সবই হয়ে যাবে কূলকিনারা হীন। কিন্তু মুনিয়াকে আর পাওয়া যাবে না কোনদিন! এখন মামলা চলবে নিজের গতিতে। বিষয়টি এখন বিচারাধীন। সুতরাং বলা যাবে না খুব বেশি কিছু।
আমার কথা অন্যত্র। মুনিয়া পাখির মত সরল চেহারা ও সরল হাসির অধিকারী এই মেয়েটির আমরা যারা ভাই, বোন, চাচা, মামা, ফুফু, খালা, আত্মীয়-স্বজন; আমাদের কি কোন দায়িত্ব ছিল না? আমরা যারা ছোট বেলা থেকে তাকে আদর-সোহাগ দিয়ে লালন-পালন করেছি, এতোটুকু বড় করেছি; তারা কি কেউ জানতাম না কতটুকু বোকা বা বুদ্ধিমান এই মুনিয়া? কতটুকু সরল বা গরল তার মন-মানসিকতা? কতটুকু ইমোশনাল সে? কতটুকু বয়স হয়েছিল তার? কী যোগ্যতা হয়েছিল তার লাখ টাকার ভাড়া বাসায় একা একা থাকার? কী এবং কতটা যৌক্তিক ছিল তার এত অর্থের উৎস? করোনাকালীন ছুটিতেও কেন সে একা একা থাকত ঢাকায়? আমরা কি কেউ জানতে চেয়েছিলাম তার কাছে এসব কথা? কেউ কি খোঁজ নিয়েছিলাম তার এই জীবন যাপনের? কেউ কি গিয়েছিলাম সে বাসায়? দেখেছিলাম সেসব ছবি? তার সেই জীবনাচরণের যৌক্তিকতা বিবেচনা করে ছিলাম কি আমাদের সামাজিক ও ধর্মীয় বাস্তবতায়? জাগ্রত ছিল কি আমাদের পারিবারিক মর্যাদাবোধ? বোঝাতে চেষ্টা করেছিলাম কি তাকে? সেকি সবার অবাধ্য ছিল? তার প্রিয় ছিল না কি কোনো স্বজন, কোন শিক্ষক, কোন ম্যাডাম? আত্মীয়-স্বজনের কেউ কি ছিলনা তার প্রিয়? কেউ কি ছিলনা তাকে শাসন করার, বারণ করার, বন্দী করার? একজন, দুজন, তিনজন, সবজন মিলে বোঝানো যেত নাকি তাকে? দেখানো যেত না কি সঠিক পথ? এতই কি বেপারোয়া ছিল সে? এক দিনেই কি চলে গিয়েছিল এতদূর? তাকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করেছি কি আমরা কেউ? ব্যর্থ হয়ে সহযোগিতা চেয়েছি কি অন্য স্বজনদের কাছে? ব্যর্থ হয়েছি কি সবাই? আমরা কিভাবে এড়াবো এই ব্যর্থতার দায়?
আমরা তাকে দিয়েছিলাম কি অতিরিক্ত আদর, উঠিয়েছিলাম কি মাথায়? গুরুত্ব দিয়েছিলাম কি তার অযৌক্তিক পছন্দের, অতি ইমোশনাল সিদ্ধান্তের? যে লোকটির সাথে মুনিয়ার এত এত ছবি সেই লোকটির বয়স ও পরিচয় জানতাম না কি কেউ? জানতাম না কি তার বিবি-সন্তানের সংবাদ? ভেবেছিলাম কি সম্পদের চাকচিক্যে ভুল করতেই পারে মধ্যবিত্ত পরিবারের অবুঝ মুনিয়া? পারিবারিক ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে আমরা কি তাকে এই শিক্ষা দিয়েছিলাম যে, নিজে পণ্য হতে হয় না; উত্তম মানুষ হয়ে উত্তম পণ্য উৎপাদনে ভূমিকা রাখতে হয়? আমাদের উচিত ছিল না কি ভেবে দেখা; কী হতে পারে এমন আকাশ-পাতাল ব্যবধানিক সম্পর্কের পরিণতি? আমরাও কি ছোট ছিলাম, অবুঝ ছিলাম, ইমোশনাল ছিলাম মুনিয়ার মতই? কেউ কি দেখিনি এমন সিনেমা-নাটক, পড়িনি এমন গল্প-উপন্যাস? দেরিতে হলেও মুনিয়া কি বলেনি এই লোক তাকে বিয়ে করবে না? বিয়ের প্রলোভনে এই অবুঝ মেয়েটির সঙ্গে কী হচ্ছে আমরা বুঝিনি কেন আগে? আমরা কি কেউ করেছিলাম দেখেও না দেখার ভান, শুনেও না শোনার ভান, জেনেও না জানার ভান? অথবা কারণে/অকারণে রাগ করে, অভিমান করে নেইনি কি তার কোন খোঁজ খবর? করেছি কি এমন ভাব; সে গোল্লায় যাক তাতে আমার কী?
নাকি আরো বেশি পাপ ছিল আমাদের কারো চিন্তায়? অন্ধ হয়েছিলাম কি সম্পদের লোভে? মুনিয়ার চোখেও ঢুকিয়ে ছিলাম কি আমাদের লোভের পেরেক? ইন্নোসেন্ট ইমোশনাল মুনিয়াকে টোপ বানিয়ে ধরতে চেয়েছিলাম কি রুই-কাতল? আমরা কেউ কি কৌশলে ঠেলে দিয়েছিলাম তাকে এই পথে? সবকিছুর বিনিময়ে করতে চেয়েছিলাম কি পাহাড় সমান সম্পদের অধিকারী? আমাদের বড়দের ব্যর্থতার, অবহেলার, দায়িত্বহীনতার, লোভলালসার শিকার নয় কি এই অপরিপক্ক মুনিয়া? তার সবকিছু ধ্বংস হয়ে যাবার কোন দায় কি আমাদের নেই? আমরা সবাই কি ভুলে গিয়েছিলাম সেই বিখ্যাত প্রবাদ- ‘পিপীলিকার পাখা হয় মরিবার তরে’ বা ‘অতি চালাকের গলায় দড়ি’ কিংবা ‘লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু’?
এমনিভাবে প্রতিনিয়ত আমাদের দ্বারা নির্মমতার শিকার হয় আমাদের অনেক সন্তান, অনেক মুনিয়া! সবকিছুর বিচার হয় না মানুষের আদালতে। বিচার চাওয়া হয় না অনেক অপরাধের। প্রমাণিত হয় না অনেক অপরাধ। তাই বলে কি আমরা মুক্তি পেয়ে যাবো এসবের দায় থেকে? মৃত্যুর প্রাক্কালে সে নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছিল তার ভুল, হয়েছিল অনুতপ্ত। চিনতে পেরেছিল তার আসল শত্রু মিত্র। ভুলে গিয়েছিল সকল আবেগ, সকল মান-অভিমান। হয়ে উঠেছিল পরিপূর্ণ পরিপক্ক। হয়তোবা তার চোখে ভেসে উঠেছিল অতি আপন আমাদের কারো কারো মুখ। তাকে শাসন না করার দায়ে, খোঁজখবর না করার দায়ে, একা একা ছেড়ে দেওয়ার দায়ে অভিযুক্ত করেছিল আমাদের। নিশ্চিত তার এই অভিযোগ থেকে আমাদের মুক্তি মিলবে না কোনদিন।


মো. রহমত উল্লাহ্
শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক।
অধ্যক্ষ -কিশলয় বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজ, ঢাকা। Email- rahamot21@gmail.com

Facebook Comments

বাংলাদেশ সময়: ৭:০৮ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ২৯ এপ্রিল ২০২১

জাপানের প্রথম অনলাইন বাংলা পত্রিকা |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

জুতার দাম ১০ লাখ ডলার!

০৯ ডিসেম্বর ২০২০

ad