ঘোষণা

নীল বসন্ত

মিল্টন জে. পালমা | রবিবার, ০৯ জানুয়ারি ২০২২ | পড়া হয়েছে 57 বার

নীল বসন্ত

রাঙ্গামাটিতে তখন বসন্তের ছড়াছড়ি। একে-তো পাহাড় বেষ্টিত নৈসর্গিক সৌন্দর্যে রাঙানো বাহারী প্রকৃতি উপরন্ত ঋতুরাজ বসন্তের নরম ছোঁয়ায় পুরো রাঙ্গামাটি যেন উপচে পড়া রূপের ঝলকে অপরূপা। চারিদিকে ছোট-বড় অসংখ্য পাহাড়-টিলা যুগ যুগ ধরে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছে আকাশ ছোঁয়ার প্রতিযোগিতায়। তারই পাদদেশে উচু-নীচু আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথ, নীল জলের নিটল খণ্ডের অস্তিত্বে শোভায়িত অসংখ্য লেকের অবস্হান সুন্দরকে করেছে আরোও সুন্দরী। লেকের নীল জলে অর্ধাবৃত্ত পাহাড়ি ললনারা কেউ সাঁতার কাটছে মনের আনন্দে আবার কেউ কেউ দল বেঁধে সাম্পানে ভাসতে ভাসতে মিশে যাচ্ছে এক জলোউদ্দ্যান থেকে অন্য জলউদ্দ্যানে। হঠাৎ এক ঝাক বুনো হাঁস শিকারীর অস্তিত্ব টের পেয়ে নূপুরের ঝংকার তুলে উড়ে গিয়ে নিমেষে মিলিয়ে যাচ্ছে দিগন্তে। ভর দুপুরের রূপালি রোদ পাহাড়ের চূড়া বেয়ে লেকের নীল জলে আছড়ে পড়ে প্রকৃতিকে করেছে আরোও সপ্নীল আরোও সুন্দরী। দূরে কোথাও কোন এক পাহাড়ি বালকের বাঁশের বাঁশিতে ভেসে আসছে ইমন আর কলাবতী রাগের মিশ্রণে বিরহী রাগিণী। চারিদিকের দৃষ্টিতে কোন মানবের অস্তিত্ব নেই কিন্তু ঐ ডাকাতিয়া বাঁশির রাগিনী এক্সরে রশ্মির মতোই সর্বগ্রাসী আঘাতে হৃদয়ের কোন একটি অংশ মোমের মতোই গলে গলে গড়িয়ে পড়ছে আঁখির অন্তরালে। কি কষ্ট ঐ বাঁশিওয়ালার? কতোটুকুই বা কষ্ট জমাট বেঁধেছে ঐ ছোট্ট হৃদয় সরোবরে? যে বেদনা মিশ্রিত সুরের তেজদ্বীপ্ত, নীল জল, পাহাড়-টিলা, লেক-জঙ্গল পুরো রাঙ্গামাটিকে সাথে নিয়ে ডুবে যাচ্ছে এক নির্বাক গহীনে? গোধূলির সূর্য পশ্চিম আকাশে হারিয়ে যেতেই এক নিথর কালো অন্ধকার। সেই কৃষ্ণ কালো অন্ধকারে ক্ষীণ কেরোসিনের আলোয় আর এক রহস্যময় জগৎ। প্রায় ঘরে ঘরেই চোলাই মদ তৈরির নিত্যদিনের মহোৎসব। পাহাড়ি ললনারা ব্যস্ত নানা রঙে সেজে প্রিয় মাতাল পুরুষের মনোরঞ্জনে, শুরু হয় পাহাড়ি নৃত্য। রাত বাড়ে পুরুষদের নেশার পাল্লা পাকস্থলী ছাড়িয়ে যখন গলায় এসে স্হির চোখে তখন স্বপ্নপুরীর রঙিন চশমা। দেহে অপ্রতিরুদ্ধ কামনা ক্রমেই ঢেউ খেলে যায়। কোন কোন দেহ লোভী পুরুষ নিজেকে সামাল দিতে না পেরে প্রিয়তমাকে জাপটে ধরে ঢুকে যাচ্ছে নিজের নড়বড়ে ডেরায়। একটু পরেই জীর্ন কুটিরের বন বাঁশের বেড়ার ফাঁক গলে ভেসে আসে খিলখিল হাসির শব্দ। একসময় নিভে যায় কেরোসিনের ক্ষীণ লন্ঠন তারপর নীরবতা পৃথিবী নিশ্চুপ। প্রথম দিনেই আমি মিশে গিয়েছিলাম তাদের সাথে এক কাতারে।

চলুন আমরা ওদিকটায় গিয়ে দাড়াই? বসন্তের কথায় নিজেকে খুঁজে পেলাম। কতক্ষণ যে বসন্তের মুখপানে চেয়ে চৌরঙ্গী চত্বরের ভিড়ের মধ্যে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ছিলাম মনে নেই। ভিড় ঠেলে যখন একটু ফাঁকা জায়গায় এসে দাঁড়ালাম লক্ষ্য করলাম হাজারো চোখ যেন আমাদের গিলে খেতে চাইছে। লজ্জা পেলাম নিজেরই ছেলে মানুষীর জন্য। প্রশ্ন করলাম, কেমন আছো বসন্ত? ভালো ; বসন্তের দুই অক্ষরের ছোট্ট জবাব। তাতেই আমি তৃপ্ত হলাম, কিন্তু বসন্তের চোখতো সেই কথা বলছে না? ঠোঁটের কোনে নেই সেই হাসি, মুখদর্পনে নেই সেই রূপের লাবণ্য, সর্বাঙ্গের চঞ্চলতায় নিথরতা স্পষ্ট। সব মিলিয়ে কোন একদিন যে বসন্ত ছিলো ঠিক বসন্তের মতোই অপরূপা? আচ্ছা বসন্ত কি তাহলে সুখী হয়নি? নাকি আমাকে আঘাত করার জন্য এমন ভাব করছে? না-না তা হতে পারেনা বসন্ত এমন বর্ণচোরা হতে পারেনা?
: এমন হন্তদন্ত হয়ে কোথায় যাচ্ছিলেন?
: আসলে আমার হাঁটার ধরনটা-ই এমন। বাড়ি ফিরবো বলে ট্যাক্সি ধরতে ওপাশটায় যাচ্ছিলাম।
: আপনার অনেক পরিবর্তন হয়েছে। হঠাৎ দেখে চিনতেই পারছিলাম না।
: তুমি কি এখন ঢাকাতেই আছো বসন্ত?
: হ্যাঁ ; মগবাজারে।
:ও আাচ্ছা?
: আপনার যদি তেমন কোন তাড়া না থাকে তাহলে বাসায় এক কাপ চা খেয়ে যেতে পারেন।
বসন্তের এমন আহবানে যেন চাঁদকে হাতে পেলাম। বললাম, তোমার বাসায় যাওয়াটা যদি শেষে কোন সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়? মানে বলছিলাম তোমার স্বামী সংসার….? সে ভাবনাটা না হয় আমারই থাক, তাছাড়া আমার স্বামী সংসার আছে তা-ইবা আপনাকে কে বললো? বসন্তের এমন কথায় আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম। ভাবলাম বসন্ত হালকা প্রতিশোধ নিতে আমাকে আঘাত করছে নাতো? না না তা কি করে হয়? তাহলে কি বসন্ত সত্যিই —? একটি টেম্পু এসে থামলো। বসন্ত বললো, চলুন যাওয়া যাক। কোন রকম আপত্তি না করে উঠে বসলাম। পেয়ারা বাগের ঘন বসতির তিন তলা বিল্ডিং এর দো’তলার একটি ফ্ল্যাটে বসন্তের বসবাস। ফ্ল্যাটে ঢুকতেই একটি ফুটফুটে মেয়ে দৌড়ে এসে বসন্তের কোলে ঝাঁপিয়ে পড়লো। বসন্ত পরম মমতায় বাচ্চাটিকে আদর করলো তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বললো, আমার মেয়ে মুনমুন। এবার সত্যিই ধাঁধার মধ্যে পড়ে গেলাম। কিছুক্ষণ আগেও বসন্ত বলছিলো তার স্বামী সংসার নেই এখন বলছে এই মেয়েটি তার নিজেরই সন্তান। রহস্যের যেন মাথামুন্ডু কিছুই বুঝতে পারছি না। আমি ড্রইং রুমে সোফায় বসলাম। পুরনো ফার্নিচার, দেয়ালে কোথাও কোথাও পেইন্টিং উঠে গিয়ে বিচ্ছিরি অবস্হা, জানালার পর্দাগুলিতে মনে হচ্ছে বেশ কয়েক বছর হাতের ছোঁয়া লাগেনি, মেঝেতে একটা কার্পেট বিছানো তাতে ধুলো ময়লা জমে আসল চেহারাটাই হারাতে বসেছে। মনে মনে বসন্তের উপর খুব রাগ হলো। অজান্তেই বিড়বিড় করে বলে উঠলাম পাহাড়ি মেয়ে থেকেছে জঙ্গলে সে সুন্দরের কদর কি বুঝবে? কিন্তু পরক্ষণেই নিজেকে বেশ অপরাধী মনে হলো। বসন্ততো এমন ছিলোনা? পনেরো বছর আগে দেখা বসন্ত আর আজকের বসন্তের মধ্যে কতো বিস্তর ব্যবধান? কি হয়েছে বসন্তের, কেনোই বা তার এমন পরিনতি? তাহলে কি বসন্ত সত্যিই সুখী হয়নি? ভাবতে ভাবতে ফিরে গেলাম পনেরো বছর আগের গুটি কয়েক সোনালি দিনে।

সরকারি চাকরিতে তখন আমি সবেমাত্র সুনামগঞ্জ জেলায় জয়েন করেছি। নতুন জায়গা পরিচিত এমন কেউ নেই যেখানে একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলা যায়। অফিসের পরে এবং ছুটির দিন গুলোতে হাতে অফুরন্ত সময় ফলে একাকীত্ব আমাকে ক্রমেই দুর্বল করে দিচ্ছে। আমার বিশ্বাস ছিলো এই মফস্বল শহরে নিশ্চয় পরিচিত না হোক অন্তত সমগোত্রীয় কাউকে খুঁজে পাবোই। খোঁজ নিতে নিতে একদিন খবর পেলাম স্হানীয় সদর হাসপাতালের কোয়ার্টারে একটি খ্রিষ্টান পরিবার রয়েছে। খবরের সূত্র ধরে ভয় লজ্জা সব পিছনে ফেলে একদিন হাজির হলাম হাসপাতালের কোয়ার্টারে। দরজায় কড়া নাড়তেই একজন মধ্য বয়ষ্ক ভদ্রমহিলা বেরিয়ে এলেন। বয়স পঁয়ত্রিশ উর্ধ্ব, গায়ের রঙ কালো এবং পেশায় নার্স যা আমি আগেই খোঁজ নিয়ে জেনেছিলাম। দরজায় দাঁড়িয়েই ভদ্রমহিলা সরাসরি প্রশ্ন করলেন, কে আপনি, কাকে চাই? আমার গলা শুকিয়ে কাঠ। কোন রকমে নিজেকে সামলে নিয়ে বললাম, আমি এ জেলায় নতুন এসেছি। কিছুদিন হলো এখানকার কৃষি বিভাগে জয়েন করেছি। আমার বাড়ি গাজীপুরের কালীগঞ্জে, আমি একজন ক্যাথলিক খ্রিষ্টান। আমি জানতে পেরেছি আপনারাও খ্রিষ্টান পরিবার তাই পরিচিত হতে এলাম। কথাগুলো এক নিঃশ্বাসে বলে প্রায় হাঁপিয়ে উঠেছি। ভদ্রমহিলা আমার নার্ভাস হওয়ার প্রকৃতি দেখে হেসে ফেললেন। তারপর আমাকে অবাক করে দিয়ে বললেন, তাহলে আপনিই সেই লোক গত সপ্তাহে যার মেডিক্যাল রিপোর্ট গুলো আমি প্রসেজিং করে দিয়েছিলাম? বলতে পারেন খ্রিষ্টান নাম দেখে একটু আগ্রহ সহকারেই তা করেছিলাম। ভদ্রমহিলা এবার ব্যস্ত হয়ে পড়লেন বললেন, দেখুনতো আপনাকে কতক্ষণ বাইরে দাঁড় করিয়ে রেখেছি? আসুন ভেতরে আসুন। ভেতরে ঢুকে সোফার উপর বসে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। ভদ্রমহিলার দুই ছেলে অজয় আর বিজয়ের সাথে কিছুক্ষণের মধ্যেই আমার ভাব জমে গেলো। একটু পরেই মহিলার স্বামী এলেন ভদ্রমহিলা তার সঙ্গে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিলেন। জানতে পারলাম ভদ্রলোক একজন উপজাতি, বাড়ি রাঙ্গামাটি জেলায় এবং পেশায় পুলিশের চাকরি করেন। সেই থেকে ঐ পরিবারের সঙ্গে আমার পরিচয় এবং তারাও আমাকে গ্রহণ করে নিলেন তাদেরই একজনের মতো করে। প্রায় মাস তিনেক পর একদিন ভদ্রমহিলা যাকে আমি পরবর্তীতে মেরী দিদি বলেই সম্বোধন করে আসছিলাম তিনি অফিসে ফোন করে বললেন, আমরা এক সপ্তাহের জন্য ছুটিতে রাঙ্গামাটি বেড়াতে যাব তুমি কি যাবে আমাদের সাথে? কোন কিছু না ভেবে এক কথায় রাজি হয়ে গেলাম। যাওয়ার দিন ধার্য হলে অফিস থেকে সাত দিনের নৈমিত্তিক ছুটি নিয়ে নির্দিষ্ট সময়ে আমরা রওনা হলাম রাঙ্গামাটির উদ্দেশ্যে। আন্তঃনগর পাহাড়িকা ট্রেন মাঠের পর মাঠ গ্রামের পর গ্রামকে পিছনে ফেলে এঁকেবেঁকে দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে দানবের মতো গর্জন করতে করতে। আমি জানালায় চোখ রেখে অজানাকে জানার উত্তেজনায় বিভোর। এভাবে প্রায় সাত ঘন্টা একটানা চলার পর আমরা সিলেট থেকে চট্টগ্রাম এসে পৌঁছলাম। তার পর চট্টগ্রাম থেকে বাসে করে উচু-নীচু পাহাড়ি পথ বেয়ে অবশেষে যখন রাঙ্গামাটিতে এসে পৌঁছলাম তখন দিন শেষের বিকেল।

বসন্তের নরম হাওয়া উপরন্ত প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য সব মিলিয়ে রাঙ্গামাটিকে মনে হলো যেন এক স্বপ্ন পুরী। মেরী দিদি আমাকে বললেন, এই গ্রামের নাম আসাম বস্তি। আমি চারিদিকে চোখ মেলে তাকিয়ে দেখলাম এখানে এখনো সভ্যতার ছোঁয়া লাগেনি, কোনদিন লাগবে কিনা তা-ও নিশ্চিত করে বলা কঠিন। মেরী দিদির স্বামীর বাস্তুভিটায় অবহেলায় অনাদরে ফেলে রাখা বহুদিনের অব্যবহৃত একমাত্র ঘরটি বাসযোগ্য করতে আমরা তিনজনে মিলে প্রায় তিন ঘন্টা চেষ্টা করেও যখন বাসযোগ্য করতে পরছিলাম না ঠিক তখন একটা কেটলি ও কয়েকটা কাপ হাতে এলো একটি পাহাড়ি মেয়ে। আমি অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে রইলাম মেয়েটির দিকে। এখানে এই নিবৃত পাহাড়ি পল্লীতে এমন সুন্দরের অস্তিত্ব থাকতে পারে যেন বিশ্বাসই হতে চাইলোনা। পাহাড়ি সংস্কৃতির কোন অস্তিত্বই তার সর্বাঙ্গে নেই। এক নিটল চঞ্চল চপলা অপূর্ব নারী। আমি তাকিয়েই রইলাম একদৃষ্টিতে অপলক তার দিকে। মেরী দিদি এগিয়ে এসে পরিচয় করিয়ে দিলেন, আমার ননদিনী ‘বসন্ত’ অবশ্য ওর ডাক নাম ‘রঞ্জু’। বসন্ত এখানকার কলেজে পড়ে খুব ভালো ছাত্রী। ভাবলাম ওর নাম রঞ্জু হতে যাবে কেনো? ওকে বসন্ত নামেই বেশি মানায়। আমি দু-হাত এক করে মাথা নুয়ে নমস্কার করলাম। বসন্ত ভীষণ লজ্জা পেয়ে চায়ের কেটলি আর কাপ রেখে দৌড়ে পালালো। আমি তাকিয়েই রইলাম যতক্ষণ বসন্তকে দেখা গেলো। মেরী দিদি আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বললেন, চলো চা খাই।

আমার সমস্ত ভাবনা জুড়ে সেদিন সারারাত কেবলই বসন্ত আর বসন্ত। কিন্তু সেদিন গোধূলি বেলা অথবা সন্ধ্যা রাতে কোথাও আর বসন্তের দেখা মিললো না। পরদিন ঘুম থেকে উঠে সকালের নাস্তা শেষে মেরী দিদি বললেন, আমাদের হাতে তো সময় খুবই কম তুমি চাইলে রাঙ্গামাটির খানিকটা ঘুরে দেখে আসতে পারো। আমি বললাম, এ-কি করে সম্ভব আমিতো এখানকার কিছুই চিনিনা জানিনা? মেরী দিদি আমাকে অবাক করে দিয়ে বললেন, বসন্ত তোমার সঙ্গে যাবে সে-ই তোমাকে সাহায্য করবে। এ যেন মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি! বসন্ত বোধহয় তৈরি হয়েই ছিলো, বেরিয়ে পড়লাম দু’জনে। প্রথমে রাঙ্গামাটির ঝুলন্ত ব্রীজ তার পর সিদ্ধি হাউজ, কলেজ ক্যাম্পাস, ক্যাথলিক চার্চ, ফরেস্ট কম্পাউন্ড এবং সবশেষে কাপ্তাই বাঁধ। কাপ্তাই বাঁধে এসে দু’জনে বসলাম একটা গাছের গুড়ির উপর। বললাম বসন্ত তুমি কি কবিতা আবৃত্তি করতে জানো? হ্যাঁ; তবে উচ্চারণ শুদ্ধ নয়। বললাম তাতে কিছু যায় আসেনা এখানেতো শ্রোতা আমি ছাড়া আর কেউ নেই? অনেক অনুরোধের পর বসন্ত বললো, কোনটা শুনবেন সুনীল না রবীন্দ্রনাথ? আমি অবাক হলাম সভ্যতা বিবর্জিত এই পাহাড়ি উপত্যকায় সুনীল আর রবীন্দ্রনাথের বিচরণ দেখে। বললাম, কবি হিসাবে সুনীলই আমার প্রিয়। বসন্ত আবৃত্তি শুরু করলো সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সেই বিখ্যাত কবিতা “কেউ কথা রাখেনি”। আমি মন্ত্রমুগ্ধ নয়নে কেবল তাকিয়েই রাইলাম বসন্তের মুখপানে। কবিতা শেষ করে বসন্ত আমাকে হঠাৎ প্রশ্ন করলো, আচ্ছা আপনার প্রিয় রঙ কোনটি? বললাম “নীল”। আচ্ছা আপনাকে যদি আমি নীল নামে ডাকি তাহলে কি আপনি রাগ করবেন? না বরং খুশিই হবো। আচ্ছা নীল, বৌদি বলছিলো আপনি খুব ভালো গান করেন একটা গান গেয়ে শুনাবেন? আমি এবার সত্যি সত্যিই বিস্মিত হলাম, ভাবলাম এরই মধ্যে বসন্ত দেখছি আমার অনেক কিছুই সংগ্রহ করে ফেলেছে? আমি সাধারণত নজরুল সংগীতের চর্চা করি তবে আধুনিকের প্রতিও দুর্বলতা আছে কোনটা গাইবো নজরুল না আধুনিক? নজরুলের কবিতার চেয়ে গানই আমার বেশি পছন্দ। আমি গান ধরলাম “মোরে ভালোবাসায় ভুলিও না, পাওয়ার আশায় ভুলিও”। গান গাইতে গাইতে লক্ষ্য করলাম বসন্ত কেমন যেন আনমনা হয়ে গেছে, কি যেন বলতে চেয়েও বার বার থেমে যাচ্ছে। গান শেষ করে বললাম, চলো বসন্ত এবার বাড়ি ফেরা যাক সন্ধ্যা হয়ে এলো। সেদিনের পর প্রায় প্রতিদিনই দু’জনে সারা রাঙ্গামাটি চষে বেড়িয়েছি। প্রকাশ্যে না হলেও আকার ইঙ্গিতে ভাব বিনিময় হয়েছে দু’জনের মধ্যে তারপর আবার বিরহের পালা। আসার দিন বসন্ত বলেছিলো জানি হয়তো আমাকে ভুলে যাবেন তবে আমি আপনাকে মনে রাখবো সারাজীবন ধরে।

রাঙ্গামাটি থেকে ফিরে আসার পর এক সপ্তাহের মধ্যে বসন্তের চিঠি পেলাম। “নীল” নামেই সম্বোধন করা অসাধারণ চিঠি। পুরো চিঠি জুড়ে কেবল একটি নারীর ভালোবাসার কি আকুল আকুতি? এমন অনেক চিঠি লিখেছে বসন্ত আমিও জবাব দিয়েছি কখনো কখনো। চোখের আড়াল হলে যেমন মনের আড়াল হয়ে যায় তেমনি স্মৃতির পাতায় ধুলো জমে জমে এক সময় সব অস্পষ্ট হয়ে গিয়েছিলো। আজ এতো বছর পর বসন্তের দেখা পেয়ে সেই অস্পষ্ট স্মৃতি গুলোই তীরের ফলার মতো বিঁধছে হৃদয় সরবরে। বসন্ত ট্রে হাতে ঢুকলো ড্রইং রুমে।
: কিছু মনে করবেন না আপনাকে অনেকক্ষণ বসিয়ে রেখেছি।
: না-না ঠিক আছে আমার কোন অসুবিধা হচ্ছেনা।
: আপনি এখন কোথায় আছেন, কি করছেন?
: বাস্তবতার সাথে লড়াই করে করে এখন আমি দেশের বাইরে।
: আপনার স্ত্রী সন্তান ওরা সব কেমন আছে?
: আমার স্ত্রী সন্তান রয়েছে সেটাই বা তোমাকে কে বললো?
আমার এমন জবাবে বসন্ত বুঝি একটু আহতই হলো। বুঝতে অসুবিধা হলোনা লজ্জা পেয়েছে তার কথার জবাব ফিরে পেয়ে। একটু কি যেন ভেবে বললো, দেখুন আমি জানি আপনি আমাকে আক্রমণ করবার জন্যই এভাবে বলেছেন কারণ আমি বলেছিলাম আমার স্বামী-সংসার নেই। কিন্তু আপনিই বলুন একে কি সংসার বলে? একে কি বেঁচে থাকা বলে? একমাত্র সন্তান ব্লাড ক্যানসারে ধুকছে, স্বামী তিন বছর হলো জেলের ঘানি টানছে, আমি সন্তানকে বাঁচাতে ছুটছি এখানে ওখানে তার পরেও আপনি একে সংসার বলবেন? কথাগুলো বলতে বলতে বসন্ত প্রায় কেঁদেই ফেললো। মনে হলো আমার ভেতর দুয়ারে হঠাৎ একটা বজ্রপাতে সব স্তব্ধ হয়ে গেলো। এক মুহূর্তের জন্য যেন বসন্তের মুখটা অস্পষ্ট হয়ে গেলো প্রায় নিঃশ্বাস বন্ধ হওয়ার উপক্রম। কোন রকমে নিজেকে সামলে নিয়ে বললাম, একি বলছো তুমি বসন্ত? এসব হলো কি করে? তোমার স্বামীই-বা জেলে কেনো? এসব শুনে আপনার কি লাভ? তাছাড়া আপনাকে দেখেতো মনে হয় বেশ ভালোই আছেন? I am sorry বসন্ত। আসলে তোমাকে আমি হার্ট করতে চাইনি। নীল ; আমি আপনাকে কেনো বাসায় আসতে বলেছি জানেন? শুধু মাত্র আমার এই করুন পরিণতিটা সচোক্ষে আপনাকে দেখাবো বলে। আমি তাকিয়েই রইলাম বসন্তের মুখপানে। বসন্ত যেন আজ বাঁধ ভাঙা পাখি, বহুদিন পর সে যেন আজ নীড় খুঁজে পেয়েছে। বসন্ত বলেই চললো তার জীবনের গল্প।

আপনাকে চিঠি লিখতে লিখতে যখন আর কোন জবাব পেলামনা তখন বৌদিকে সবকিছু জানিয়ে একটা চিঠি লিখলাম। বৌদি জানালো আপনি সুনামগঞ্জ থেকে বদলি হয়ে অন্যত্র চলে গেছেন। এরপর থেকে এভাবেই আপনার স্মৃতিকে বুকে লালন করে কাটছে আমার দিন মাস বছর। এমনই এক দুঃসময়ে পলাশ এলো রাঙ্গামাটির ফরেস্ট অফিসার হয়ে। চোলাই মদের সূত্র ধরেই বাবার সাথে তার পরিচয়। প্রায় রাতেই আমাদের বাড়িতে এসে বাবার সাথে চোলাই মদ গিলতো আর মাতাল হয়ে কখনো বাংলোয় ফিরত আবার কখনো আমাদের বাড়িতেই থেকে যেতো। আমি লক্ষ্য করলাম ক্রমেই আমাদের পরিবারে সচ্ছলতা আসতে লাগলো। বুঝতে পারলাম এসব পলাশের টাকাতেই হচ্ছে। এক সময় পলাশ আমাকে বিয়ের জন্য বাবার কাছে প্রস্তাব দেয় কিন্তু আমি তা প্রত্যাক্ষান করি। এতে পলাশ আরোও বেপরোয়া হয়ে উঠে। শুরু হয় আমার উপর পারিবারিক নির্যাতন। অবশেষে সবাইকে সুখী করতে রাজি হলাম পলাশকে বিয়ে করতে। বিয়ের পর দু’বছর বেশ ভালোই চলছিলো। হঠাৎ পলাশের মধ্যে আমি অন্যরকম পরিবর্তন দেখতে পেলাম অর্থাৎ সে টাকা ছাড়া আর কিছুই বুঝেনা। ওর ঘুষ আর দুর্নীতির কথা ফাঁস হয়ে গেলে রাঙ্গামাটি থেকে পলাশকে ঢাকায় বদলি করা হলো। এরই মধ্যে জন্ম হয় আমাদের একমাত্র সন্তান মুনমুনের। ভেবেছিলাম মেয়ের মুখ চেয়ে এবার অন্তত পলাশের পরিবর্তন হবে কিন্তু না ; টাকার প্রতি লোভ ওর আরোও বেড়ে যায়। অসৎপথে দু’হাতে অজস্র টাকা কামাতে থাকলো। এই যে এই ফ্ল্যাটটা দেখছেন এটা অসৎ পঁয়সায় কেনা তাই এর কোন পরিচর্যা আমি করিনা। শুধু মেয়েটাকে নিয়ে পথে নামতে হবে তাই চোখ-কান বন্ধ করে এখানে পড়ে আছি। একদিন হঠাৎ পুলিশ বাড়ি রেড করলো। নগদ কয়েক লক্ষ টাকা আর নামে বেনামে কয়েকটি ব্যাংক একাউন্ট জব্দ করা সহ পলাশকে গ্রেফতার করে নিয়ে গেলো। ঘুষ আর দুর্নীতির দায়ে আদালতে পলাশের আট বছরের সাজা হলো। আমি আমার একমাত্র মেয়েকে নিয়ে প্রায় পথে নামতে বসেছি। অনেক চেষ্টা করেছি একটা চাকরি জোগাড় করতে। অবশেষে এ.জি চার্চের মি. পিটার অধিকারীর সহযোগীতায় মিরপুরে একটা অবৈতনিক স্কুলে এই চাকরিটা পেলাম। সামান্য বেতন যা পাই তার বেশির ভাগই চলে যায় মুনমুনের ঔষধের খরচ জোগাতে বাকি যা থাকে তা দিয়ে কোন রকমে সংসার চালাই। মাঝে মাঝে মনে হয় সবকিছু ছেড়ে আত্মহত্যা করি কিন্তু মেয়েটার মুখ চেয়ে তা-ও করতে পারিনা। বলতে বলতে বসন্ত হু-হু করে কেঁদে ফেললো। আমি নির্বাক হয়ে বসে রইলাম, মনে মনে আত্মগোপনে নিজেকে বড়ই অপরাধী মনে হলো। ভাবলাম তাহলে কি আমার জন্যই বসন্তের আজ এই পরিণতি? না-না এ হতে পারেনা আমিতো বসন্তকে কেবল একজন ভালো বন্ধু কিংবা গাইড হিসাবে পাহাড়ি উপত্যকায় আবিষ্কার করেছিলাম মাত্র, ভালোবাসার অর্ধাঙ্গিনী রূপে নয়? আমি উঠে দাঁড়ালাম, বললাম আজ চলি বসন্ত সন্ধ্যা হয়ে এলো। বসন্ত দরজা পর্যন্ত এসে বিদায় জানালো। রাস্তায় নেমে এসে উদ্দেশ্যহীন ভাবে হাঁটছি কোথায় যাচ্ছি সেদিকে কোন খেয়াল নেই। অবশেষে যখন ট্যাক্সি করে বাড়িতে এসে দরজায় কড়া নাড়লাম তখন মধ্যরাত। আমার স্ত্রী তখনও জেগে আছে আমার অপেক্ষায়।

এরপর আরোও দু’দিন গিয়েছি বসন্তের ফ্ল্যাটে। কথা হায়েছে একে অপরের কষ্টের কথা, পাওয়া না পাওয়ার বেদনার কথা। এছাড়াও ফোনে প্রায়ই যোগাযোগ হয়। শেষবার যখন বসন্তের ফ্ল্যাটে গিয়েছিলাম তখন একটা অদ্ভুত পরিবর্তন লক্ষ্য করলাম। বসন্তের মধ্যে আর সেই কষ্টের ছোঁয়া নেই, ড্রইং রুমটা ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করা হয়েছে সাজানো হয়েছে শৈল্পিক কায়দায়। জানালায় পুরনো পর্দাগুলি আর নেই সেগুলি নামিয়ে সেখানে নতুন পর্দা শোভা পাচ্ছে। এক কথায় বসন্তের জীবনে যেন আবারও বসন্তের ছোঁয়া লেগেছে। বসন্ত সেদিন খাবারের আয়োজন করেছিল, আমি খেতে অস্বীকৃতি জানালেও শেষ পর্যন্ত ওর অনুরোধের কাছে হার মানলাম। খাবার টেবিলে বসে বসন্তের মুখপানে চেয়ে ভাবছিলাম এই বসন্ত আমার কি না হতে পারতো? একটি নিবৃত পাহাড়ি পল্লীর প্রাণ চঞ্চল নারী তার ভালোবাসাকে হারিয়ে জীবন নামের বিশাল সমুদ্রে হাবুডুবু খেতে খেতে হঠাৎ ক্ষীণ আলোয় পরিচিত ডাঙার দেখা পেয়ে কি অদ্ভুত ভাবে তাকে আঁকড়ে ধরার আপ্রাণ আকুতি? কিন্তু বসন্ত তো তার ভালোবাসার কথা আমার কাছে এভাবে প্রকাশ করেনি কোনদিন? কেনো সেদিন বসন্ত এমন করেছিলো? এদিকে আমারও ছুটি প্রায় শেষের পথে ইচ্ছা না থাকলেও আবারও উড়াল দিতে হবে সেচ্ছা নির্বাসনে। বসন্তের সাথে এভাবে যোগাযোগ রাখাটা নিশ্চয়ই আমার অনধিকার চর্চা। তবে কি এবারেও বসন্তকে না জানিয়ে নিবৃতে হারিয়ে যাব? বসন্ত হয়তো কষ্ট পাবে তা পাক না তবুও তো আমার স্ত্রী আর নিজের বিবেকের কাছে আমি শুদ্ধ রইলাম? সেদিন চলে আসার সময় দরজার কাছে এসে আমাকে বিদায় জানাতে গিয়ে বসন্ত জিজ্ঞেস করেছিলো, কবে যাচ্ছেন দেশ ছেড়ে? আমি সরাসরি কোন উত্তর না দিয়ে বলেছিলাম, জানাব। সেদিনের পর থেকে ইচ্ছে করেই বসন্তের সাথে আর যোগাযোগ রাখিনি। ফোন দিলে ব্যস্ততা দেখিয়ে এড়িয়ে গিয়েছি। কিন্তু এবার বেশ কয়েকদিন হলো বসন্ত আর ফোন দিচ্ছেনা। মনের ভিতর এক ধরণের অপরাধবোধ কাজ করছে, ইচ্ছে করছে ছুটে যাই বসন্তের পানে কিন্তু সে পথও রুদ্ধ কারণ বসন্ত হয়তো ভাবছে আমি যে কাপুরুষ ছিলাম সেই কাপুরুষ হয়েই আছি এখনো। কিন্তু সে কি কখনো ভেবেছে আমি বাস্তবতার কঠিন চত্বরে সংসার নামক এক কঠিন বলয়ে বন্দি?
সেদিন টিকেট কনফার্ম করে বাড়ি ফেরার পথে বার বার মনে হয়েছে বসন্তকে এক পলক দেখে যেতে। বসন্ত বলেছিলো মুনমুনের সময় ফুরিয়ে আসছে ডাক্তার বলেছে যে কোনো সময় হাসপাতালে ভর্তি করতে হতে পারে। বসন্তকে না হয় বাদ-ই দিলাম মুনমুনের জন্য হলেও তো আমার একবার যাওয়া উচিৎ? কিন্তু আমার স্ত্রী এতোই ঘন ঘন ফোন দিচ্ছিল যে বাধ্য হলাম ঘর মুখী হতে। আসতে আসতে ভাবছিলাম আজ আমার স্ত্রী-কে সব খুলে বলবো। বসন্ত, রাঙ্গামাটি, আসাম বস্তি, আমার জীবনে নীলের অস্তিত্ব, মুনমুন সবকিছু। কিন্তু কিছুই বলতে পারলাম না তার প্রণয়ের কাছে সবই কোথায় যেন মিলিয়ে গেলো।

ঘড়িতে তখন মধ্যরাত পেরিয়ে পৃথিবী আলোর মুখ দেখতে দ্রুত প্রহর গুনছে কিন্তু আমার চোখে ঘুম নেই। আজ কেনো জানি বসন্তের চাইতে মুনমুনের কথাই বেশি করে মনে পড়ছে। এরই মধ্যে আমার স্ত্রী দু-তিনবার জেগে উঠে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়েছে। ঘুমিয়ে পড়ার কয়েকটি কৌশলও শিখিয়ে দিয়েছে আমি চেষ্টাও করলাম কয়েকবার কিন্তু ফলাফল শূন্য। আমার সমস্ত সত্বা জুড়ে কেবল বসন্ত আর মুনমুনের বিচরণ। ভোরের দিকে হঠাৎ মোবাইল ফোন বেজে উঠলো। বসন্তের নাম্বারটা দেখে বুকটা কেঁপে উঠলো। এই ভোর বেলায় বসন্তের ফোন, কি হয়েছে বসন্তের? পাশ ফিরে দেখলাম আমার স্ত্রী গভীর ঘুমে মগ্ন। সাবধানে ফোন রিসিভ করলাম।
: হ্যালো ; কি হয়েছে বসন্ত? এতো রাতে কেনো ফোন দিয়েছ?
: নীল ; সন্ধ্যা রাতে মুনমুনকে হাসপাতালে ভর্তি করিয়েছি। এখন আইসিইউতে আছে।
: এসব তুমি কি বলছ বসন্ত? মুনমুন এখন কেমন আছে?
: ডাক্তার বলেছে আশা খুবই ক্ষীণ যে কোনো সময় হৃদপিণ্ডের স্পন্দন থেমে যেতে পারে।
বসন্তের চাপা কান্নার আওয়াজ ভেসে আসছে। এরই মধ্যে লাইনটা কেটে গেলো আমি পুনরায় লাইন পেতে বটম টিপছি কিন্তু বসন্ত ফোন রিসিভ করছেনা। আমার স্ত্রী ঘুম জড়ানো কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো, কে ফোন করেছিলো? আমার বুকটা ধড়াস করে উঠলো, কি বলবো ঠিক বুঝে উঠতে পারলামনা। সত্যি কথাটাই বলবো না মিথ্যা বলবো? এই কিছুক্ষণ আগেও যার বুকে মাথা রেখে আবেগে আপ্লূত হতে হতে বলেছি ভালোবাসি তোমাকে, সেই ভালোবাসার অর্ধাঙ্গীনিকে কি করে মিথ্যে বলি? কিন্তু সত্যি কথাটা বললে যদি সংসারে জ্বলে উঠে অশান্তির আগুন, জন্ম হয় সন্দেহ নামক হিংস্র ব্যাধির? বললাম, রং নাম্বার। সে বললো, কি যে হয়েছে আজকাল রং নাম্বারে এতো কল আসে কেনো? বলেই আবার ঘুমিয়ে পড়লো। বুকটা আবারো কেঁপে উঠলো, তাহলে কি সে সব শুনেছে? শুনলে শুনুক জানলে জানুক আমাকে যে আজ বসন্তের ডাকে সাড়া দিতেই হবে অন্তত মুনমুনের জন্য হলেও। বসন্তের এই দুর্দিনে তার পাশে আমাকে দাঁড়াতেই হবে।

কোন রকমে সকাল হতেই আমি ঢাকায় যাব বলে তৈরি হচ্ছি। আমার স্ত্রী এক কাপ চা হাতে এসে আমাকে দিতে দিতে জিজ্ঞেস করলো, কোথায় যাচ্ছ? বললাম, ঢাকায় জরুরী কাজ আছে। আমাকে অবাক করে দিয়ে সে বললো, তুমি কোথায় যাচ্ছ আমি বোধহয় কিছুটা আন্দাজ করতে পারছি। কাল রাতে তুমি যখন ফোনে কথা বলছিলে তখন আমি সবই শুনেছি সুতরাং আমার কাছে লুকিয়ে কোন লাভ নেই। যাচ্ছ যাও তবে সাবধানে যেও আর সন্ধ্যার আগে বাড়ি ফিরে এসো, আমি অপেক্ষায় থাকবো। আমি বললাম, আসলে বিষয়টা তোমাকে বহুবার বলতে চেয়েছি কিন্তু পারিনি শেষে তুমি যদি—? আমাকে থামিয়ে দিয়ে সে বললো, এখন আর দেরি নয়, বেশি দেরি করলে হয়তো বাচ্চাটাকে আর দেখতে পারবেনা। মনে মনে স্ত্রীর প্রতি শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে এলো। রওনা হলাম ঢাকার উদ্দেশে এবং আমি যখন হাসপাতালে গিয়ে পৌঁছলাম তখন সব শেষ। মুনমুনের ছোট্ট হৃদপিণ্ডের দাপাদাপি অনেক আগেই বন্ধ হয়ে গেছে। বসন্ত সন্তান হারিয়ে পাথর হয়ে বসে আছে লাশের পাশে। খুব বেশি কষ্ট পেলে যেমন মানুষের চোখের জল শুকিয়ে যায়, চোখ কান্নার ভাষা হারিয়ে ফেলে বসন্তের বেলায়ও বুঝি তাই ঘটলো। নিকটাত্মীয়রা কেউ কাঁদছে আবার কেউ কেউ লাশ গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার তাগাদা দিচ্ছে। বসন্ত একবারও আমার দিকে চোখ তুলে তাকালো না। এক জমকালো নিথরতায় বসন্ত যেন সেজেছে আজ নতুন সাজে। আমি মুনমুনের মুখের উপর থেকে পর্দাটা সরিয়ে একবার ওর মুখটা দেখে নিলাম। কি নিষ্পাপ মুখ! প্রাণ চাঞ্চল্যে ভরা ছোট্ট শিশুটি কি ভয়ংকর শান্ত হয়ে ঘুমিয়ে আছে। কি অন্যায় করেছিলো এই নিষ্পাপ শিশুটি? তবে কি ওরই জন্মদাতার পাপের প্রায়শ্চিত বিধাতা এই শিশুটির উপর দিয়েই প্রতিশোধ নিলো? আমার বুকটা ব্যথায় চৌচির হয়ে যাচ্ছে, বসন্তের মুখের দিকে তাকানো যাচ্ছে না। ভাবলাম বসন্ত এখন কি করবে কি নিয়ে বাঁচবে সে? আমি পায়ে পায়ে হাসপাতাল চত্ত্বর পেরিয়ে রাস্তায় নেমে এসে হাঁটছি উদ্দেশ্যহীন এলোপাতাড়ি। কোথায় যাচ্ছি আমার গন্তব্যই বা কোন দিকে সেদিকে কোন খেয়াল নেই। আমি কেবলই ভাবছি রাঙ্গামাটির পাহাড়ি পথ, আসাম বস্তি, নীল জলের নিটল খন্ডের বিচ্ছিন্ন লেক, ঝুলন্ত ব্রীজ, কলেজ ক্যাম্পাস, কাপ্তাই বাঁধ আর সেই পাহাড়ি নিবৃত পল্লীতে চোখ মেলে দেখা নীলের মধ্যে বসন্তের দাপাদাপি।

 

Facebook Comments

বাংলাদেশ সময়: ৮:১২ অপরাহ্ণ | রবিবার, ০৯ জানুয়ারি ২০২২

জাপানের প্রথম অনলাইন বাংলা পত্রিকা |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

নীরব-নিথর অবয়ব

১৩ সেপ্টেম্বর ২০২১

চন্দ্রাবলী

১৬ নভেম্বর ২০২০

অনুগল্পঃ মানুষ

১০ ডিসেম্বর ২০২০

এডুকেশন

২৩ ডিসেম্বর ২০২০

স্বর্গ থেকে বিদায়

০৯ ডিসেম্বর ২০২০

কারিগর

২৪ জানুয়ারি ২০২১

চারাগাছ

২৬ জানুয়ারি ২০২১

বাটপার

১৩ আগস্ট ২০২০

নিশি মানব

২৫ জুন ২০২১

রূপকথা

২৬ এপ্রিল ২০২০