ঘোষণা

অলিভিয়া

পপি চৌধুরী | বুধবার, ০৭ এপ্রিল ২০২১ | পড়া হয়েছে 157 বার

অলিভিয়া

কেঁপে ওঠে এডেনের ডানহাতের মুঠোয় বন্দী অলিভিয়ার বামহাতটি। কেঁপে ওঠে বুঝিবা ভিতরটিও। আলগোছে অলিভিয়া হাতটি ছাড়িয়ে নেয় এডেনের উষ্ণ মুঠি থেকে, দ্রুত বারান্দা থেকে নেমে চলে যায় বাগানের দিকে।
অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে এডেন, সবুজ বৃক্ষের অন্তরালে ক্রমশ হারিয়ে যাওয়া লাল জ্যাকেট পরা অলিভিয়ার অপসৃয়মাণ দেহটার দিকে। মধুর বিকেলটায় হঠাৎ বিষণœতা ভর করে মনে। প্রতিজ্ঞা করে, আর কখনই সে ছুটে আসবে না অলিভিয়ার ডাকে। হয়তো তার এভাবে ছুটে আসাকে খুব হালকা ভাবে নিয়েছে অলিভিয়া। তাকে ভেবে নিয়েছে সহজলভ্য, কারণ ডাকলেই তো সে ছুটে আসে। আর এটা তো চিরন্তন সত্য যে, সহজলভ্য বস্তুর প্রতি মানুষের আগ্রহ কম। নাহলে কী এমন দোষ করেছে সে? কেবল ওর হাত ধরে বলেছে, ‘চলো না এবার থিতু হই দু’জনে।’ সে তো কোন অন্যায় কিছু বলে নি। তিন বছর ধরে সম্পর্ক দু’জনের। এদেশে এত দীর্ঘসময় ধরে প্রেম করে কেউ? অন্য কেউ হলে এতদিনে লিভ টুগেদার করতো, নয়তো বিয়ে করে দিব্বি সংসার শুরু করে দিতো। হয়তো দু’একটি সন্তানও হয়ে যেতো। কারণ সন্তান মানেই তো বছর বছর সরকারের কাছ থেকে বড় অংকের আর্থিক বেনিফিট পাওয়া।
মনে মনে ভাবে এডেন। যত ভাবে, ততই বিষণœতা বেড়ে যায়। অলিভিয়াকে এখনও ঠিকমত বুঝতে পারে না সে। সব সময়ই কেমন যেন রহস্যময় মনে হয় ওকে। অথচ এই তিন বছরে যতটুকু বুঝেছে তাতে মনে হয়েছে, ও খুব পরিচ্ছন্ন একটি মেয়ে। মন থেকে যে এডেনকে পছন্দ করে, তাও বুঝতে পারে। তবে একসাথে বসবাসের, কিংবা বিয়ের কথা বললে সবসময়ই কেমন যেন নিশ্চুুপ হয়ে যায়। এড়িয়ে যেতে চায় বিষয়টি। কতবার ওর পরিবারের সাথে পরিচিত হতে চেয়েছে, প্রতিবারই বলেছে, সময় হলে ও নিজে থেকেই পরিচয় করিয়ে দেবে সবার সাথে। তিনবছর পার হতে চলল, আর সময় হবে কবে!
এসব কথা ভাবতে ভাবতে এডেনের চোখের সামনে ভেসে ওঠে, অলিভিয়ার সাথে প্রথম পরিচয়ের দিনটি। তিনবছর পূর্বে একদল শৌখিন পর্যটকের সাথে বাফেলো গিয়েছিল এডেন। গিয়েছিল পৃথিবী বিখ্যাত নায়েগ্রা ফলস দেখতে। ইন্টারনেটে খুঁজে খুঁজে একটি চাইনিজ ট্যুর অর্গানাইজিং কোম্পানী থেকে বেছে নিয়েছিল চারদিনের ট্যুরটি। নায়েগ্রাফলস, থাউজ্যান্ড আইল্যান্ড এবং ওল্ড নায়েগ্রা ফোর্ট। অলিভিয়ার সঙ্গে প্রথম পরিচয় নায়েগ্রা ফলস-এর সামনে। একা একা সেলফি তুলছিল অলিভিয়া।
ওকে এভাবে সেলফি তুলতে দেখে এডেন নিজে থেকে যেচে বলেছিল, ‘কিছু মনে না করলে আমি ছবি তুলে দিতে পারি আপনার।’ সাথে সাথে ‘থ্যাঙ্ক ইউ’ বলে মোবাইলটি এগিয়ে দিয়েছিল এডেনের দিকে। এডেন বেশ কিছু ছবি তুলে দিয়েছিল ওর। ছবিগুলি দেখে খুশি হয়ে অলিভিয়া বলেছিল, ছবিগুলি সুন্দর হয়েছে। প্রফেশনাল?
: কিছুটা।
প্রতিত্তুরে অলিভিয়ার মিষ্টি হাসি। এরপর কথা প্রসঙ্গে এডেন জানতে পারে, তারা একই বাসের যাত্রী। ফলে দু’জনের আরো অনেকবার দেখা হয়, কথাও। এডেন জানতে পারে, অলিভিয়া বেড়াতে ভালোবাসে। তার কাছে একটি লিস্ট আছে, সেই লিস্ট ধরে বিগত এক বছর যাবত বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়াচ্ছে সে।
: আপনার লিস্টের পরবর্তী দর্শনীয় স্পট কোনটি?
কৌতুহল থেকে জানতে চেয়েছিল এডেন?
: ইজিপ্ট। তবে আমি সেটি বাদ দিয়ে দিয়েছি।
: ইজিপ্ট অনেক সুন্দর জায়গা, বিশেষ করে পিরামিড।
: জানি। তাইতো খুব ইচ্ছে ছিল যাওয়ার।
: শুধু ইজিপ্ট নয়, আরো অনেক দেশের নাম আমার ভ্রমণ তালিকা থেকে বাদ দিতে হয়েছে!
একটু থেমে পুনরায় বলে অলিভিয়া।
মনের ভিতর একরাশ কৌতুহল নিয়ে অলিভিয়ার মুখের দিকে তাকায় এডেন। ওর নীল দু’চোখে আবিস্কার করে একরাশ বিষণœতা। অহেতুক প্রশ্ন করে বিব্রত করতে চায় না। সেটা অভদ্রতাও। তাই নীরব থাকে। তবে ওকে কিছু জিজ্ঞেস করতে হয় না, নিজে থেকেই বলতে শুরু করে অলিভিয়া।
: ছোটবেলা থেকেই আমার স্বপ্ন ছিল, সারা পৃথিবী ঘুরে বেড়াবো। ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময় লম্বা একটি তালিকা বানিয়ে রেখেছিলাম, কখন কোন দেশে বেড়াতে যাবো তার। অনিবার্য কিছু কারণে তালিকাটিকে ছোট করতে হয়েছে। আপাতত যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে যাওয়ার চিন্তা বাদ দিয়েছি। ঠিক করেছি, শুধু আমার দেশটিকেই দেখবো ঘুরে ফিরে। জানিনা, আমার সে স্বপ্ন পূরণ হবে কিনা!
: নিশ্চয় হবে।
এডেনের কথা শুনে অলিভিয়ার ঠোঁটের কোণে ভেসে ওঠে এক টুকরো ম্লান হাসি।
: আপনিও বেড়াতে পছন্দ করেন নিশ্চয়?
পাল্টা জানতে চেয়েছিল এডেনের কাছে।
: নিশ্চয়ই। তবে এর সাথে আরো একটি কারণ আছে। আমি লেখক। বিভিন্ন ট্যুরিস্ট ম্যাগাজিনে লিখি। তাই মাঝে মাঝেই ঘুরতে বেরিয়ে পড়ি। বিভিন্ন ট্যুরিস্ট স্পট ঘুরে সে সম্পর্কে লিখি পত্রিকায়। আপাতত এটাই আমার নেশা, এবং পেশা।
: বেশ মজার জব তো আপনার!
: মজার, তবে মাঝে মাঝে ফ্যামিলিকে মিস করি।
: সঙ্গে আপনার স্ত্রীকে নিতে পারেন, তাহলে ট্যুরটা আরো এনজয়াব্ল হবে।
: স্ত্রী এখনও হয় নি। তবে মা-কে আমি খুব মিস করি। কারণ যখন আমার সাত বছর বয়স, তখন আমার বাবা-মায়ের সেপারেশন হয়ে যায়। আমার বাবা ইন্দোনেশিয়ান। সেপারেশনের পর দেশে ফিরে গিয়ে আবার বিয়ে-থা করে সংসার জীবন শুরু করেছেন, অথচ আমার মা আর বিয়েই করেন নি। কেবল আমার জন্য। যেটা এদেশে কেউ করে না।
: আপনার মা আপনাকে অনেক ভালোবাসেন।
: সব মা-ই তার সন্তানকে ভালোবাসেন। তবে কেউ কেউ থাকেন ব্যতিক্রম।
: ঠিক বলেছেন।
: আমার সম্পর্কে তো অনেক কথা বললাম, আপনার কথা কিছু বলুন।
: আমি ছিলাম একজন আর্টিস্ট। স্টেজ পারফরম্যান্স আর্টিস্ট।
: গ্রেট! কী মজার কান্ড দেখুন, আমি লেখক, আপনি আর্টিস্ট। দুজনেই আমরা শিল্প-সংস্কৃতি জগতের মানুষ।
: ছিলাম, তবে এখন ছেড়ে দিয়েছি সব।
: কেন!
বিস্মিত কণ্ঠে জানতে চায় এডেন।
: বেড়াবো বলে। এখন আর ওসব ভালো লাগে না।
কেমন যেন বিষণœতার সুর বাজে অলিভিয়ার কণ্ঠে।
: অলিভিয়া, ক্যালিফোর্নিয়াতে কোথায় থাকেন আপনি?
এডেনের প্রশ্নের জবাবে অলিভিয়া কেবল মিষ্টি করে হাসে। উত্তরটা যে সুকৌশলে এড়িয়ে গেল, বুঝে নেয় এডেন। তাই ওদিকে আর এগোয় না।
চার দিনের ট্যুরে ঘোরাফেরার মাঝেও অনেক কথা হয় দু’জনের। তারপর একসময় ফিরে যায় যে যার গন্তব্যে।

প্রায় একসপ্তাহ পর এডেনের কাছ থেকে একটি ফোন পায় অলিভিয়া।
: কেমন আছেন অলিভিয়া?
: এডেন?
বিস্ময়ে চিৎকার করে ওঠে অলিভিয়া।
: আপনি তো ফোন করলেন না, তাই আমিই করলাম।
: করবো ভেবেছিলাম, তবে হঠাৎ করে হসপিটালে…
: কী হয়েছিল?
: আতঙ্কিত কন্ঠে প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয় এডেন।
: আমার এক আত্মীয় হঠাৎ অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন কিনা তাই…
মুহূর্তে কথার লাগাম টেনে ধরে অলিভিয়া।
: থ্যাঙ্কস গড। আমি ভেবেছিলাম আপনি নিজেই বুঝি…
নিজের জন্য এডেনের এই উদ্বিঘœতা ভালো লাগে অলিভিয়ার। নিজেকে কেমন যেন সুখি সুখি মনে হয়।
: আপনি আমাদের এ সপ্তাহের পত্রিকা দেখেছেন?
: আপনাকে বললাম না, আত্মীয় অসুস্থ ছিলেন, তাই অন্যদিকে মনোযোগ দিতে পারি নি।
: স্যরি! ঠিকানা জানা থাকলে পোস্ট করে দিতে পারতাম একটি কপি। কারণ ওটাতে আপনার জন্য একটি সারপ্রাইজ আছে।
: কী সারপ্রাইজ?
: এক্ষুণি বলতে চাই না।
: ও-কে রাখছি তাহলে। চললাম পত্রিকা যোগাড় করতে। বা…ই…
এডেনকে আর কোন কথা বলার সুযোগ না দিয়ে লাইন কেটে দেয় অলিভিয়া।
***
যখন অলিভিয়ার ভাই পত্রিকাটি এনে দিল তার হাতে, মুগ্ধ বিস্ময়ে তাকিয়ে রইলো অলিভিয়া। কভার পেজে তার ছবি! পিছন থেকে তোলা। সামনে নায়েগ্রা ফলস-এর উত্তাল জলরাশি।
: ছবিটা কখন তুলল এডেন!
কৌতুহল থেকে হাতে তুলে নিল সেলফোন। ওপাশ থেকে ভেসে এলো এডেনের কন্ঠ;
: হ্যালো ডিয়ার…
ডিয়ার! ভিতরটা কেঁপে উঠলো অলিভিয়ার। নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,
: কখন তুললে ছবিটা? আমি টেরই পাই নি।
: বলো কেমন সারপ্রাইজ দিলাম।
: খুব সুন্দর হয়েছে ছবিটি। মেইল আইডি টেক্সট করে দিচ্ছি, আমায় সেন্ড করে দাও প্লীজ।
: ওকে ডিয়ার। তোমার আরো কিছু চমৎকার ছবি আছে, সেগুলোও পাঠিয়ে দেব সঙ্গে।
: থ্যাঙ্ক ইউ ডিয়ার।

ধীরে ধীরে গভীর হয় সম্পর্ক দুজনের। এডেন যেখানেই যায় বেড়াতে, সবসময় নিজের টিকেটের সাথে আরো একটি টিকেট বেশি কাটে। এডেনকে টাকা দিতে গিয়ে প্রতিবার যুদ্ধ করতে হয় অলিভিয়াকে। এডেন কিছুতেই নেবে না। তার একটাই কথা, সে তার ফ্রেন্ডের জন্য কেটেছে, এতে লাভ তার নিজেরই। কারণ অলিভিয়া গেলে এডেনের ট্যুরের আনন্দটা হান্ড্রেড পার্সেন্ট হয়। অলিভিয়ার কথা, নিতেই হবে তাকে, নাহলে সে আর কখনও, কোথাও বেড়াতে যাবে না এডেনের সাথে। অগত্যা টাকাটা নিতে হয় এডেনকে।
ঘুরতে ঘুরতে এভাবে কেটে যায় তিনটি বছর। এডেনের মা খুব চাইছেন, তার ছেলে এবার বিয়ে করে সংসারী হোক। গ্রান্ড মা হয়ে তিনি কাটাবেন বাকীটা জীবন। এডেনেরও তাই ইচ্ছে। বিয়ে করে সংসারী হওয়া। কিন্তু যাকে নিয়ে সে তার স্বপ্ন রচনা করেছে, সে যেন ধরাছোঁয়ার বাইরে! যতই তাকে ছুঁতে চায়, ততই সে দূরে থাকতে পছন্দ করে! অথচ এবারের এই ট্যুরে এডেন এসেছে অলিভিয়ার আহবানেই। কয়েকদিন পূর্বে ফোন করে বলেছিল, সে কোন ফরেস্টে বেড়াতে যেতে চায়। আর সেজন্যেই তো সে ইন্টারনেটে অনেক সার্চ করে এই জায়গাটি খুঁজে বের করেছে। ভেবেছে, এই সুযোগে ফাইনাল করে ফেলবে নিজেদের থিতু হওয়ার বিষয়টি। অথচ অলিভিয়া কথাটি বলার কোন সুযোগই দিল না তাকে। অভিমানে মনটা বেঁকে বসে এডেনের।
***
প্রায় পাঁচ মাস হতে চলল অলিভিয়ার সাথে কোন যোগাযোগ নেই এডেনের। মাস তিনেক পূর্বে অবশ্য একবার ফোন করে বলেছিল, সে বাহামা দ্বীপে বেড়াতে যেতে চায়। এডেন বলেছে, সে খুব বিজি, এখন যেতে পারবে না। তারপর আর ফোন করে নি অলিভিয়া, এডেনও কলব্যাক করে নি। সে ইচ্ছে করেই নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখতে চেষ্টা করেছে। শিক্ষা দিতে চেয়েছে অলিভিয়াকে। যদিও খুব কষ্ট হচ্ছে তার। তবুও জোর করে নিজেকে ব্যস্ত রাখতে চেষ্টা করছে কাজে।

হঠাৎ একদিন সকালে অলিভিয়ার ফোনে ঘুম ভেঙ্গে গেল এডেনের। সেলফোনের ¯্র‹ীনে অলিভিয়ার মুখ দেখে একরাশ খুশি ছড়িয়ে পড়লো দেহমনে। উচ্ছ্বসিত কন্ঠে বলল,
: হাই ডিয়ার…
: কেমন আছো এডেন?
: আমাকে ভুলে তুমি ভালো থাকতে পারলে, আমি পারবো না কেন?
: আমার ওপর অনেক রেগে আছো।
: তাতে কারই বা কী এসে যায়!
: আমি জানি, আমাকে নিয়ে অনেক কৌতুহল, অনেক প্রশ্ন তোমার মনে। তোমাকে বলেছিলাম, যেদিন সময় হবে সেদিন নিজে থেকেই তোমাকে সব জানাবো আমি। সময় হয়েছে এডেন। সময় হয়েছে তোমাকে সব জানাবার। কাল আমাদের বাসায় সারাদিনব্যাপী একটি বিশেষ পার্টি আছে, তোমাকে আসতে হবে। তবে এই পার্টির একটি নিয়ম আছে। কোন অবস্থাতেই মন খারাপ করে থাকা চলবে না। যা ইচ্ছে পরিধান করো, যা খুশি বলো, নাচো, লাফাও, গান করো, প্রার্থনা করোÑ যা খুশি করো, শুধু মন খারাপ করে থাকতে পারবে না। এই একটাই নিয়ম মানতে হবে।
: আমার পক্ষে বোধহয় অ্যাটেন্ড করা সম্ভব হবে না, জরুরী কাজ আছে।
: যত জরুরী কাজ থাক, কাল তোমাকে আসতেই হবে।
: আমায় যে আসতে বলছো, কখনও নিজের বাসার ঠিকানা দিয়েছো আমাকে?
একরাশ অভিমান ঝরে পড়ে এডেনের কন্ঠ হতে।
: এখুনি টেক্সট করে দিচ্ছি সোনা।
: কাল আমি খুব বিজি থাকবো, কারণ পরশু একটি ট্যুরে যেতে হচ্ছে।
: আমি কোন কথা শুনতে চাই না, কাল তোমায় আসতেই হবে। কথা দিচ্ছি, তোমার সব প্রশ্নের জবাব তুমি পেয়ে যাবে কাল। দুপুর বারোটার মধ্যে তোমায় হাজির চাই পার্টিতে।
কথাটা বলেই ফোনের লাইন কেটে দিল অলিভিয়া। খুশিতে দুহাতে গায়ের কম্বল ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে আনন্দে চিৎকার করে উঠলো এডেন।
***
পরদিন এগারোটা না বাজতেই সেজেগুঁজে তৈরি হয় এডেন। বাসা থেকে বের হওয়ার পূর্বে মা-কে হাগ দিয়ে বলে, ফিরে এসে আজ তোমায় একটি ভালো সংবাদ দিতে পারবো মা।
: ঈশ্বর তোমার মঙ্গল করুন। আমি প্রতীক্ষায় থাকবো।

হাতে একগুচ্ছ লাল গোলাপের তোড়া নিয়ে বারোটা বাজার দশ মিনিট পূর্বে এডেন পৌঁছে যায় অলিভিয়ার বাড়ির গেটে। বাইরে থেকেই বোঝা যাচ্ছে, ভিতরে কোন উৎসব চলছে।
গেটে নিজের পরিচয় দিতেই সমাদরে ভিতরে নিয়ে যাওয়া হয় তাকে। বড় একটি হলঘরে এসে পৌঁছায় এডেন। অলিভিয়াকে খুঁজে ফেরে তৃষ্ণার্ত দু’চোখ। রঙ বেরঙের ফুল আর বেলুন দিয়ে সাজানো ঘরটির কোথাও দেখতে পায়না তাকে। এগিয়ে আসে অলিভিয়ার ভাই। নিজের পরিচয় দিয়ে বলে,
: অলিভিয়া তৈরি হচ্ছে, আপনি আসন গ্রহণ করুন। কিছুক্ষণের মধ্যেই এসে পড়বে ও।
প্রতীক্ষার প্রহর গুণতে গুণতে ঘরের চতুর্দিকে চোখ বুলিয়ে নেয় এডেন। বিশাল হলরুমটির একপাশে একটি মঞ্চ সাজানো। আরেক পাশে সারি সারি চেয়ার সাজানো অতিথিদের বসার জন্য।
ধীরে ধীরে অতিথিতে পূর্ণ হতে থাকে হলরুম। সবাই বসে পড়ে যার যার আসনে। হঠাৎ বেহালায় বেজে ওঠে সুর। সকলের মাঝে কেমন যেন চঞ্চলতা পরিলক্ষিত হয়। বসা থেকে উঠে দাঁড়ায় সকলে। ধীরে ধীরে একটি হুইল চেয়ার ঠেলে নিয়ে আসে অলিভিয়ার বোন মারিনা। হুইল চেয়ারে বসা অলিভিয়া। পরণে সাদা-নীলে মিলানো কিমানো। মুখটি শুকিয়ে আগের থেকে যেন অনেক ছোট হয়ে গিয়েছে, গায়ের রঙটিও কেমন যেন বিবর্ণ, মলিন।
লাল গোলাপের তোড়া হাতে এডেনকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে অলিভিয়া। গ্রে কালারের স্যুট পরেছে এডেন, খুব চমৎকার লাগছে ওকে। মনে মনে ভাবে সে।
অলিভিয়াকে দেখে নিজের আবেগ চেপে রাখতে পারে না এডেন। উত্তেজিত কণ্ঠে জানতে চায়,
: কী হয়েছে তোমার অলি, হুইল চেয়ারে কেন তুমি?
হ্যান্ডশেক করার জন্য হাত বাড়িয়ে দেয় অলিভিয়া। ভূতগ্রস্তের ন্যায় নিজের ডান হাতটি বাড়িয়ে দেয় এডেন। ভুলে যায় বামহাতে ধরা গোলাপ গুচ্ছের কথা।
: হাই ডিয়ার… আমি ঠিক আছি, তুমি ভালো তো?

অলিভিয়ার প্রশ্নের কোন জবাব দিতে পারে না এডেন। অলিভিয়ারও বোধহয় উত্তর শোনার আগ্রহ নেই। তার হুইল চেয়ার এগিয়ে যায় সামনের দিকে। একে একে সবার সামনে যায় অলিভিয়া, হাত মেলায় সকলের সাথে, কুশলাদি জিজ্ঞেস করে সকলের।
এরপর অলিভিয়াকে নিয়ে যাওয়া হয় মঞ্চে। একটি মাইক্রোফোন তুলে ধরা হয় তার সামনে। কৃত্রিম কাশি দিয়ে গলাটা পরিস্কার করে নেয় অলিভিয়া। তারপর বলা শুরু করে,
“আজ একটি বিশেষ দিন। আমার প্রিয় স্বজন এবং বন্ধুরা, আপনাদেরকে বলছি। আমি জানি আপনারা সবাই আমাকে ভালোবাসেন। আমিও আপনাদের সবাইকে ভালোবাসি, অনেক অনেক ভালবাসি। আজ আপনাদের সবাইকে ডেকেছি, কারণ আমি অন্য একটি দেশে চলে যাচ্ছি। যাওয়ার পূর্বে সবাইকে নিয়ে আনন্দ করতে চাই। আজ আমরা গান শুনবো, নাচ দেখবো, সুস্বাদু খাবার খাবো, রয়েছে ড্রিংকস-এর ব্যবস্থাও। আপনাদের কাছে আমার একটাই অনুরোধ, বলতে পারেন শেষ অনুরোধ- আজ আমি সবার মুখে হাসি দেখতে চাই। হাসিমুখে আপনারা বিদায় দেবেন আমাকে।”
সাথে সাথে করতালিতে মুখর হয়ে ওঠে হলরুম। তালি দিতে ভুলে যায় কেবল এডেন। তার কাছে সবকিছু কেমন যেন হেয়ালীপূর্ণ মনে হয়। আজকের পার্টি, অলিভিয়ার কথাবার্তা… সব! অলিভিয়াকেও তার কেমন যেন অচেনা মনে হতে থাকে।
এরপর অলিভিয়াকে সরিয়ে নেয়া হয় মঞ্চ থেকে। শুরু হয় নাচ-গানের পালা। পাশাপাশি পানাহার তো আছেই।
দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়, বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা। একসময় ক্লান্ত অলিভিয়াকে বিশ্রামের জন্য নিয়ে যাওয়া হয় অন্যরুমে। কিছুক্ষণ পর মারিনা এসে এডেনের কানে কানে বলে, অলিভিয়া কথা বলতে চায় তার সাথে।
এতক্ষণে যেন হাফ ছেড়ে বাঁচে এডেন। সে তো এই মুহূর্তটির জন্যই অপেক্ষা করছিল।
মারিনার সাথে পাশের রুমে প্রবেশ করে এডেন। তাকিয়ে দেখে, বিছানায় সোজা হয়ে শুয়ে আছে অলিভিয়া। কোমর পর্যন্ত একটি কম্বল দিয়ে ঢাকা।
: এসো এডেন।
এডেনকে দেখতে পেয়ে আহবান জানায় অলিভিয়া। খাটের পাশের চেয়ারটি দেখিয়ে বলে, বোসো।
দ্রুতপায়ে এডেন এগিয়ে যায় অলিভিয়ার কাছে। বসতে বসতে ম্লানকণ্ঠে বলে,
: আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না অলিভিয়া, কোথায় যাচ্ছো তুমি?
অলিভিয়া তাকায় বোন মারিনার দিকে। মারিনা দরজা টেনে দিয়ে বের হয়ে যায় রুম থেকে।
: আমার ওপর তোমার অনেক রাগ, তাই না?
: আসলে কী হচ্ছে, আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।
: তুমি কি আমার হাতটা একটু ধরবে!
একরাশ মিনতি ঝরে পড়ে অলিভিয়ার কণ্ঠ হতে।
এডেন অলিভিয়ার শীর্ণ ডানহাতটি তুলে নেয় নিজের হাতে।
: খুব অবাক হচ্ছো তাইতো? শোন, গত সাড়ে তিন বছর ধরে লু গ্রিগস রোগে ভুগছি আমি। চিকিৎসকরা জানিয়েছিলেন, এই রোগের ফলে ধীরে ধীরে আমার শরীরে প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিকল হতে শুরু করবে। শুধু তাই নয়, এই রোগের ফলে শরীরে অসহ্য যন্ত্রণা হবে। খবরটি শোনার পর ঘুরে বেড়ানোর একটি তালিকা তৈরি করি। কারণ জীবনের শেষ ক’টি দিন আনন্দের মধ্যে দিয়েই কাটাতে চেয়েছি আমি। তাই ঘুরে বেড়িয়েছি পছন্দের জায়গাগুলিতে। তবে গত চার মাস ধরে শারীরিক অবস্থা খুবই খারাপ। তার সঙ্গে বেড়েছে অসহ্য যন্ত্রণা। তুমি হয়তো শুনে থাকবে, কয়েক মাস পূর্বে ক্যালিফোর্নিয়ায় একটি সুইসাইড আইন পাস হয়েছে। তাতে মৃত্যু শয্যায় থাকা কোন রোগী চাইলে স্বেচ্ছা মৃত্যু বেছে নিতে পারবে।
এডেন আর্তনাদ করে ওঠে। শক্ত হাতে আকড়ে ধরে অলিভিয়ার হাতটি। বলে,
: বোলো না এসব কথা। তুমি সুস্থ হয়ে যাবে, আমি তোমাকে অন্য ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবো।
: পাগলামি কোরো না সোনা। তুমি হয়তো জানো না, আমি এখন কিছু খেতে পারিনা, দাঁত ব্রাশ করতে পারিনা, কিছুই করতে পারি না নিজে।
: আমি করে দেবো তোমার সব কাজ…
: আমাকে দূর্বল করে দিও না, হাসিমুখে চলে যেতে দাও আমাকে। এখন সাতটা বাজে। পনের মিনিট পূর্বে সন্ধ্যা ৬টা ৪৫ মিনিটে ইঞ্জেকশন নিয়েছি আমি। আর পৌনে চার ঘণ্টা আয়ু আছে আমার। এই সময়টুকু তুমি নিজে হাসবে, আমায় হাসাবে। কষ্ট হলেও আমার জন্য করবে কাজটি। আমি যে তোমাকে অনেক ভালোবাসি এডেন…
অলিভিয়ার কথা শুনে এডেন হাসতেও পারে না, কাঁদতেও না। মুখের চেহারা হয়ে যায় কিম্ভূতকিমাকার।

ধীরে ধীরে অলিভিয়ার রুমে এসে জড়ো হয় সবাই। হাসছে সকলে। বাবা-মা এগিয়ে এসে হাগ দেন অলিভিয়াকে। বাবা-মায়ের চোখের কোণে টলমলে মুক্তোবিন্দু দেখতে পায় অলিভিয়া। সাথে সাথে আদেশের সুর ধ্বনিত হয় তার কণ্ঠে,
: বাবা? মা?
মুহূর্তে নিজেদের সামলে নেন অলিভিয়ার বাবা-মা। হাসি ফুটিয়ে তোলেন মুখে। এক এক করে সবাই এগিয়ে এসে হাগ দেয় অলিভিয়াকে। এরপর হাতে হাত ধরে প্রার্থনা সঙ্গীত গাইতে থাকে তারা। সকলের চোখে জল, মুখে হাসি। স্মিত হাসি ছড়ানো মুখটি ধীরে ধীরে বিবর্ণ হতে থাকে অলিভিয়ার, গভীর প্রশান্তিতে একসময় চোখ দুটি বুঁজে আসে তার। (একটি সত্য ঘটনা অবলম্বনে)
———-
পপি চৌধুরী:
আমেরিকা প্রবাসী, সম্পাদক নারী ম্যাগাজিন।

Facebook Comments

বাংলাদেশ সময়: ৫:২৩ পূর্বাহ্ণ | বুধবার, ০৭ এপ্রিল ২০২১

জাপানের প্রথম অনলাইন বাংলা পত্রিকা |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

চন্দ্রাবলী

১৬ নভেম্বর ২০২০

এডুকেশন

২৩ ডিসেম্বর ২০২০

অনুগল্পঃ মানুষ

১০ ডিসেম্বর ২০২০

চারাগাছ

২৬ জানুয়ারি ২০২১

মালতি

২৫ জুলাই ২০২০

কারিগর

২৪ জানুয়ারি ২০২১

 ফুটপাথ

৩০ জুলাই ২০২০

বাটপার

১৩ আগস্ট ২০২০

স্বর্গ থেকে বিদায়

০৯ ডিসেম্বর ২০২০

মেষপালক  মুসা মিয়া

০৪ জানুয়ারি ২০২১

আমাদের গল্টু

১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২১

সোনাদিঘি

১৪ জুলাই ২০২০