ঘোষণা

জাতীয় শোক দিবসে আমি স্মরণ করছি আমার মাকে

। শেফালী ডি কস্তা। | সোমবার, ১৭ আগস্ট ২০২০ | পড়া হয়েছে 152 বার

জাতীয় শোক দিবসে আমি স্মরণ করছি আমার মাকে

১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শাহাদাত বরণ দিবস। আমরা জাতীয় শোক দিবস হিসেবে এই দিবসটি পালন করি গভীর শোক এবং শ্রদ্ধার সাথে। সেই সংগে যোগ হয়েছে আমাদের পরিবারে একটি শোক। ২০০৫ সালের এই দিনে আমাদের প্রাণপ্রিয় মা চলে গেছেন পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে। তাই জাতীয় শোক দিবসটি এলে আমরা আলাদা করে শোক প্রকাশ করতে পারি না।

মা যেদিন মারা যান সে দিনটিতে সারা দেশে ছিল অর্ধদিবস হরতাল। দুপুর ২টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত আমি ছিলাম অফিসের কাজে ব্যস্ত। প্রতিদিনের মত কাজে মনোনিবেশ করলাম, বিকাল ৪টার সময় ভাইস্তা (ভাইয়ের ছেলে) বউ ফোন করে বলল, পিসি (আদুরী মা) খুব অসুস্থ পড়েছে। তুমি যত তাড়াতাড়ি পার বাড়ি আস। আদুরী মা তোমাকে খুব দেখতে চাচ্ছে। আমার মাকে আত্মীয়-অনাত্মীয়, ছোটবাড় প্রায় সবাই আদুরী মা বলে ডাকতো।

মায়ের অসুস্থতার খবর শুনে আমি খুব একটা গুরুত্ব দেইনি। কাজের মধ্যে নিজেকে ব্যস্ত রাখলাম। কারণ, এর আগে বেশ কয়েকবার এমন হয়েছিল। আমি ধরেই নিয়েছিলাম যে, আমি বাড়ি গেলেই মা আমাকে দেখে সুস্থ হয়ে যাবে ঠিকই। কারণ এর আগেও যেহেতু এরকম হয়েছে কয়েকবার। মায়ের প্রচন্ড অসুস্থতার সংবাদ পেয়ে ব্যতিব্যস্ত হয়ে আমি সব কাজ ফেলে গ্রামের বাড়ি গিয়েছি মাকে দেখতে আর মা আমাকে দেখেই সুস্থ হয়ে গেছেন। উল্টো মা যেন আমাকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। আমাকে দেখে মায়ের সে কী আনন্দ তার। তাই এবারেও আমি ভেবেছিলাম সেই আগের মতনই হয়তো অবস্থা হবে।

হাতের সব কাজ গুছিয়ে শেষ করে আস্তে ধীরে গ্রামে বাড়ির উদ্দেশে রোনা দিলাম। ঢাকা থেকে বাড়ি কাছেই। তারপরেও বাড়ি গিয়ে পৌছতে বেলা গড়ালো। অর্ধেক পথ যেতেই ফোন আসে বাড়ি থেকে। ফোন রিসিভ করতেই বলল, আদুরী মা আর নেই, আদুরী মা নেই। ওহ! সেকি অবস্থা। পুরো পৃথিবী যেনো আমার ভেংগে পড়লো মাথার উপর। আমি মা–গো বলে চিৎকার দিয়ে উঠলাম। সাথে সাথে হাতের ফোনটা আমি ছুঁড়ে দিলাম আমার স্বামীর হাতে। তখনি আমি জ্ঞান হারালাম।
তারপর বাকি পথ কিভাবে গেলাম, কিছুই বলতে পারবো না।

বাড়ির কাছাকাছি যেতেই শুনতে পেলাম বাড়িতে কান্নার রোল, আদুরী মা, আদুরী মাগো বলে কান্নাকাটি করছে বাড়ির সবাই। সকলের কান্নার শব্দে আমার কান্নার শব্দ কেউ শুনতে পেলো না তখন। মনে হলো, হায়, এ আমি কি করলাম। !! ” কেন আমি আর একটু সময় আগে আসতে পারলাম না? বাড়ি গিয়ে দেখি মা বিছানায় শুয়ে আছে। মায়ের চারিদিকে বাড়ির এবং আশেপাশের সব আত্মীয় স্মজন। তাকিয়ে দেখি মায়ের সেই মিষ্টি হাসিটি তখনও তার মুখে লেগে আছে। নিথর শরীর, চোখ দুটি তার বন্ধ। মাকে জড়িয়ে ধরে কত ডাকলাম, মা, মা-গো, আমি এসেছি, দেখো। মা আর চোখ খুললো না। একটি কথাও বললো না মা আমার সাথে। যেনো কঠিন অভিমান করেছে মা আমার সাথে। কোনো কথা না বলে চলে গেলো না ফেরার দেশে।

মাকে ডেকে বললাম, মা তোমাকে কত বড় অবহেলা করেছি, তোমার কাছে থাকার জন্য কত অনুনয় করতে, আরও একটি দিন থেকে যা মা বলে। মা তার সাথে একটি রাত বেশী থাকলে কত যে খুশী হতেন। তখন তো শুধু চাকরি , কাজ, কত অজুহাত দেখিয়ে চলে যেতাম বাড়ি থেকে শুধু সময় নাই বলে অযুহাত দেখিয়ে।

আজ কত অবসর, কত সময় আমার হাতে, অথচ আজ তুমি নাই মা।
তুমি আজ থাকলে তোমাকে জড়িয়ে ঘুমাতাম, কত গল্প শুনতাম, মামা বাড়ির গল্প করতাম। ছোট বেলার গল্প, ছোট ভাই বোনদের গল্প, সুখ দুঃখের গল্প,,৷

মাকে আজ আমার বড় বেশী মনে পড়ছে। মাছাড়া আজ আমি বড়ই একা মা। একে আমার প্রিয়জনেরা চলে যাচ্ছে আমায় ছেড়ে। আমি যেনো ক্রমেই অসহায় হয়ে পড়ছি।

মা স্বর্গ থেকে আমার এবং আমাদের সকলের জন্য প্রার্থনা করো। আমরা যে এই হতাশা আর অশান্তির পৃথিবীতে পড়ে আছি। আমরা প্রার্থণা করি তুমি যেনো শান্তিতে থাকো স্বর্গে পরম পিতার আশ্র‍য়ে থাক। আমেন।

————

। শেফালী ডি কস্তা।

Facebook Comments

বাংলাদেশ সময়: ৭:১৮ অপরাহ্ণ | সোমবার, ১৭ আগস্ট ২০২০

জাপানের প্রথম অনলাইন বাংলা পত্রিকা |