ঘোষণা

মালিহার কবরে আমি এখনও যাই, ভুলতে পারিনা আমি ওর পবিত্র মুখ

রীতা আক্তার | সোমবার, ৩১ আগস্ট ২০২০ | পড়া হয়েছে 396 বার

মালিহার কবরে আমি এখনও যাই, ভুলতে পারিনা আমি ওর পবিত্র মুখ

প্রতিটি মানুষের জীবনে কিছু না কিছু গল্প থাকে।নিরব বেদনা সে গল্পে পাতায় রোজ চোখ বুলায়। অস্পস্ট স্মৃতি গুলো বারবার থমকে দাঁড়ায় বর্তমানের চৌকাঠে।
তবুও কি মানুষ মুছতে পারে তার কষ্টের অধ্যায়টুকু?
পারে না।
আর পারেনা বলেই দৃষ্টি চলে যায় দূর থেকে দূরে। কান্নায় জমে থাকে ক্লান্ত মনের উঠোন।
আজ তবে সেই স্মৃতিচারণ করি……।

২০০৮ সালের ৭ই জুন প্রথম প্রেগনেন্সি নিয়ে ভর্তি হলাম ফার্মগেটের আল রাজি হাসপাতালে। দীর্ঘ নয় মাস পর মনের মধ্যে এক সুখ অনুভূত হচ্ছিল আমার। প্রথম মা হওয়ার আনন্দ। আমি ও আমার হাজবেন্ড দুই জনেই চেয়েছি আমাদের প্রথম সন্তান মেয়ে হোক। ডাক্তার বললেন ৮ই জুন সকাল ১১ টায় আমার ডেলিভারি হবে। আজানা এক ভয় আমার মনের মধ্যে জেকে বসে ছিলো। সারা রাত ঘুম হলোনা আমার। বিছানায় একবার এপাশ একবার ওপাশ করে সারা রাত পার হয়ে গেলো।

ভোর হলো, হাসপাতালের রুম থেকে বের হলাম। রুমের পাশেই বারান্দা ছিলো, গিয়ে দাড়ালাম বারান্দার রেলিংটা ধরে। অনেক্ষন তাকিয়ে থাকলাম আকাশটার দিকে। আর চিন্তা করতে লাগলাম টাকার যোগাড় করতে পারবে তো আমার হাজবেন্ড। বলে রাখা ভালো, আমার হাজবেন্ড নারায়নগঞ্জ জেলার রুপগঞ্জ উপজেলায় একটি পেপার মিলে চাকরি করতেন। খুব স্বল্প বেতনের চাকরি। আমরা ওখানে একটি রুম ভাড়া করে থাকতাম। ঘরভাড়া, মাসিক চাল, ডাল কেনার পর যতসামান্য টাকা হাতে থাকতো যা দিয়ে পুরো একটা মাস চালানো আমাদের খুব কষ্ট হতো।

একদিকে সংসার চালানো অন্যদিকে প্রেগনেন্সির জন্য এখন থেকেই টাকা যোগাড় করে রাখতে হবে। আমি যে বাড়িতে ভাড়া থাকতাম সেখানে কয়েকটি বাচ্চাকে আমি পড়াতাম। মাস শেষে কেউ আমাকে ২০০ কেউবা ১০০ টাকা দিতো আমার বেতন হিসেবে। তার মধ্যে যারা টাকা দিতে পারতো না তারা বিনা বেতনেই আমার কাছে পড়তো। মাস শেষে সব টাকা জমিয়ে রাখতাম আসন্ন বিপদের জন্য। সাথে হাজবেন্ডের বেতনের কিছু টাকা ওখানে সংযোজন হতো।

প্রেগনেন্সির সময়ে মেয়েদের শরীর ও মনের অনেক পরিবর্তন আসে। মুখে রুচিরও পরিবর্তন হয়। মাঝে মাঝে অনেক কিছু খেতে ইচ্ছা করতো। কিন্তু মুখ ফুটে ওকে কখনও বলতাম না।জানি, বললে ও কিনে এনে খাওয়াবে। খামখা টাকা নষ্ট করে তো লাভ নাই। তার উপর প্রতিমাসে ডাক্তারের চেক আপ, ঔষধের খরচ তো আছেই। খুব কষ্ট করে ১৭ হাজার টাকা জমিয়েছি।জানালার রেলিংটা ধরে সে কথাই ভাবছিলাম। একজনের কাছে টাকা চেয়ে রেখেছিলো সেটা আনার জন্যই নারায়নগঞ্জ গেছে আমার হাজবেন্ড।

ঘড়ির কাটা একটু একটু করে ১১টার দিকে এগোতে লাগলো। বেডে শুয়ে আছি। ডাক্তার আসলেন, সবকিছু চেকআপ করে নিলেন। আমাকে হুইল চেয়ারে করে নিয়ে যাওয়া হলো লেবার রুমে। একটি বেডে আমাকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে ও টি তে। যাওয়ার পথে আমার মা, বোন, আমার হাজবেন্ড ও টির গেট পর্যন্ত আসতে লাগলো। আমি সমানে কাঁদছি, মনে হচ্ছে সবাইকে ছেড়ে আমি চলে যাচ্ছি। মনের মধ্যে চিন্তা আর ভয় আমাকে কুড়েকুড়ে খাচ্ছিলো। চোখ থেকে সমানে শুধু পানি বের হচ্ছিলো আমার। আমাকে রেখে নার্সরা বের হয়ে গেলো ও টির রুম থেকে।

চারপাশে কত প্রকার বড় বড় মেশিন। মাথার উপরে বড়বড় লাইট। মেশিন গুলোকে একএকটা দৈত্যের মতো মনে হচ্ছিলো আমার। ভয়ে চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছা করছিলো, ভয়ে কোন শব্দ মুখ থেকে বের হচ্ছিলো না আমার। চোখটা বন্ধ করে পেটে হাত রাখলাম আর আয়তুলকুরসি পড়তে লাগলাম। কিছুক্ষন পর ডাক্তার নার্স এসে গেলো। আমার অপারেশন শুরু হলো।একজন ডাক্তার আমার সাথে কথা বলতে লাগলেন, আমার মাথায় হাত রাখলেন। আমাকে সাহস দিলেন।

কিছুক্ষন পর কান্নার আওয়াজ শুনতে পেলাম। ডাক্তার আমাকে বললেন রীতা তোমার মেয়ে হয়েছে। একজন বয়স্ক নার্স ছিলেন তিনি আমাকে আমার নাম দিয়েছিলেন খুশি, কারন যখনই আমি চেকআপে যেতাম সবসময় হাসিখুশি থাকতাম। তো ঐ বয়স্ক নার্স আমার মেয়েকে আমার কাছে আনলেন। আমার মেয়েকে আমি দেখলাম আর ওর কপালে আলতো করে চুমু দিলাম।কি এক আজানা অনুভুতিতে আমার দু চোখে পানি এসে গেলো। তারপর আমার আরকিছু মনে নেই যখন জ্ঞান ফিরলো তখন আমি বেডে।

নিয়ম মাফিক হাসপাতাল থেকে আমার বাবার বাসায় চলে গেলাম।আমার মেয়ের নাম রাখলাম মালিহা। জন্মাবার পর থেকে মালিহার কেবল ঠান্ডা লেগে থাকতো। এত সাবধানে থাকতাম আমি তাও ওর ঠান্ডা লেগে থাকতো। ওর যখন আড়াই মাস তখন আমার মা দেখলেন ও যখন শ্বাস প্রশ্বাস নেয় তখন ওর বুকের খাচাটা কেমন ভেসে উঠে। মনের মধ্যে অজানা ভয় জমতে লাগলো। ডাক্তার দেখালাম কিছু ধরা পড়লোনা। পরে অন্য ডাক্তার দেখালাম। ডাক্তার মেয়ের ইকো পরীক্ষা করতে বললেন। ল্যব এইডে গেলাম ইকো টেস্ট করতে। কেনো যেনো মনে হচ্ছিলো ওর হার্টে কোন বড় সমস্যা হয়েছে। কাউকে আমার মনের কথা বললাম না। শুধু আল্লাহকে ডাকছিলাম যেনো বড় রকমের কিছু না হয়।

পরদিন রিপোর্ট নিয়ে গেলাম ডাক্তারের কাছে। ডাক্তার দেখে বললেন আমার মেয়ের হার্টে দুটি ছিদ্র আছে, একটি বড়, অন্যটি ছোট। শুনে আমার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়লো, পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে গেলো। ডাক্তারের কাছে জানতে চাইলাম এর কোন চিকিৎসা নেই? তিনি বললেন মাদ্রাজে যা বর্তমানে ভারতে চেন্নাই নামে পরিচিত। তাও আবার সম্ভাবনা কম। তাও আবার অনেক টাকার ব্যপার। যা হোক ঢাকা শিশু হাসপাতালের একজন শিশু বিষেশজ্ঞের তত্বাবধারে আমার মেয়ের চিকিৎসা চলতে থাকলো। ডাক্তারের চেম্বারের পাশে আমি বাসাভাড়া নিলাম।বাসায় কেবল আমি আর আমার বাচ্চা থাকতাম।

যেহেতু আমার হাজবেন্ডের চাকরী নারায়নগঞ্জ সেহেতু তার যেদিন নাইট ডিউটি থাকতো সেদিন সকালে আসতেন আবার চলে যেতেন। প্রতিটি রাত কাটতো আমার নির্ঘুমে। আমি জানি যে কোন সময় আমার মেয়ে আমাকে ছেড়ে চলে যাবে না ফেরার দেশে। এটা যে কতো কষ্টের তা আমি আপনাদের বলে বোঝাতে পারবো না। যদি আমার টাকার সমস্যা না হতো তবে বড় হাসপাতালে আমি চেক আপ করাতাম এবং প্রেগনেন্সির সময় মেয়ের রোগটা ধরা পড়তো, সে অনুযায়ি চিকিৎসা করাতাম আর আজ আমাকে এ দিন টি দেখতে হতো না, আর আমি আমার মেয়ের ভালো চিকিৎসা করাতে পারতাম। আমার বাচ্চাটা বেচে থাকতে অনেক কষ্ট পাচ্ছিল তা আমি বুঝতে পারছিলাম কিন্তু এই গরীব অসহায় মায়ের পক্ষে কিছুই করার ছিলো না, শুধু আল্লাহকে ডাকা ছাড়া। সব সময় হাসি খুশি থাকতো মেয়েটি। ওর হাসি এখনও আমি ভুলতে পারিনা। এখনও পারিনা হাত পা নেড়ে খেলা করা সবকিছু।

এভাবে ডিসেম্বর মাস এসে গেলো।২১ তারিখ সে দিন। আমার হাজবেন্ডের নাইট ডিউটি শেষ করে বাসায় চলে এসেছে। বিকালে রেডি হচ্ছিলো অফিসে যাওয়ার উদ্দেশ্যে গেট পর্যন্ত গিয়ে আবার ফিরে এলো, বল্ল আজ আর অফিসে যাবো না। আমি বললাম অফিসে না গেলে যদি কনো অসুবিধা হয়। ও বল্ল সমস্যা হবে না ফোন করে দিলেই হবে। আমি বললাম ঠিক আছে। ও আর গেলো না অফিসে। আমি চা বানাতে গিয়ে আমার হাত থেকে একটি পিরিচ পড়ে ভেঙ্গে গেলো। কখনও আমার হাত থেকে কোন কিছু ভাঙ্গে না। কাচের জিনিষ ভাঙ্গতেই মনের মাঝে খচখচ করতে লাগলো। মনের মধ্যে কেমন যেনো অসস্হি হচ্ছিল।

রাত ১০ টা বাজে, মেয়েকে খাইয়ে আমরা খেতে বসলাম, আমি খাচ্ছি আর মেয়ের দিকে বারবার তাকাচ্ছি। খেলছে আর আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে। খাওয়া শেষ করে শুতে গেলাম, রাত তখন ১১ টা বাজে, হঠাৎ করে দেখলাম আমার মেয়েটি কেমন যেনো করছে। তাড়াতাড়ি ওকে কোলে তুলে নিলাম। শুধু একটা হেচকি দিলো মুহূর্তেই আমার কোলটি অনেক হালকা হয়ে গেলো। মনে হচ্ছিলো আমার কোলে কিছু নেই। তাড়াতাড়ি গেলাম ডাক্তারের চেম্বারে। ডাক্তার বের হয়ে যাচ্ছিলেন, আমাদের দেখে চেম্বারে ঢুকলেন, মালিহাকে পরীক্ষা করে বললেন শিশু হাসপাতালে নিতে হবে। রাস্তায় তখন না পাচ্ছি কোন সি এন জি, না পাচ্ছি কোন গাড়ি। একটা সি এন জি পেতেই চলে গেলাম হাসপাতালে।

এমারজেন্সিতে নেওয়া হলো। ডাক্তার দেখে যা বললেন তা যেনো না শুনলেই ভালো হতো। মালিহা নেই, ও মারা গেছে। ও চলে গেছে আমাকে ছেড়ে যেনো বিশ্বাস করতে পারছিলাম না।চিৎকার করে কাঁদছি, বুকটা ফেটে যাচ্ছিল আমার। এরপর জানিনা কি হয়েছিলো আমি কাঁদতে কাঁদতে কোন দিকে যে চলে গিয়েছিলাম তা নিজেও জানি না। আমার হাজবেন্ড রাস্তায় দৌড়ে গিয়ে আমাকে ধরে নিয়ে আসলেন। কারো কোন কথাই যেন কানে যাচ্ছিলনা আমার। মেয়েকে কোলে নিয়ে চুপ করে বসে ছিলাম। বাসায় যখন গেলাম তখন রাত ২ টা বাজে।

আত্নিয়রা চলে এসেছে আমার বাসায়। মালিহা নেই যেনো বিশ্বাসই হচ্ছিলো না আমার। মনে হচ্ছিল ও ঘুমিয়ে আছে । ঘুম থেকে জাগলে যেনো আমার দিকে তাকিয়ে হাসবে। আমার মা ওকে গোছল করিয়ে দিলেন। হুজুর আসলো সাদা কাপড়ে মোড়ানো হলো,দোয়া দূরুদ পড়া হচ্ছিল। মালিহাকে আমার সকল প্রকার ঋণ থেকে মওকুফ করলাম। একটা নিশ্পাপ মুখ ঘুমিয়ে আছে। আমি এখনও ভুলতে পারিনা ওই মুখটা। ওকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে দাফন করানোর জন্য। আমি যেনো পারলে ওর কবরে গিয়ে ওর সাথে থাকি। আমার যে কেমন লাগছিলো তা কাউকে বোঝাবার ক্ষমতা আমার নাই। শুধু মনে হচ্ছিল ও কবরে একা কি ভাবে থাকবে। ও যখন দেখবে আমি নাই তখনও কেঁদে উঠবে। ওর কবরের কাছে গিয়ে পড়ে থাকতে চাইতাম।কিন্তু কেউ আমাকে যেতে দিতো না। তারপরও যেতাম, ওকে দোয়া করে আসতাম। এখনও যাই, যেখানে আমার ছোট্ট সোনা চিরতরে ঘুমিয়ে আছে।
———–

Facebook Comments

বাংলাদেশ সময়: ১০:৫৪ পূর্বাহ্ণ | সোমবার, ৩১ আগস্ট ২০২০

জাপানের প্রথম অনলাইন বাংলা পত্রিকা |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

হে অনন্তের পাখি

৩০ আগস্ট ২০২০