ঘোষণা

কমরেড ইন্দ্রাণী তালুকদার, তোমায় অন্তিমবারের মতো জানাই লাল সেলাম

সুবীর পাল, এডিটর, দ্য অফনিউজ | মঙ্গলবার, ২৫ মে ২০২১ | পড়া হয়েছে 176 বার

কমরেড ইন্দ্রাণী তালুকদার, তোমায় অন্তিমবারের মতো জানাই লাল সেলাম

তুমি কে? বন্ধু ইন্দ্রাণী নাকি কমরেড ইন্দ্রাণী!
এটা কি করলে ইন্দ্রাণী? খুব ভালো করলে তো? কিরকম না জানিয়ে চলে গেলে বলো? সেই এক কোভিক শিকার। অনেক গুলো বছর আগেকার কথা। তুমিই আমাকে ফেসবুকে খুঁজে বের করেছিলে। খুব মনে পড়ছে, সেই বন্ধুত্ব এত উচ্চ মার্গে ও এত প্রাণবন্ত নিঃপাপ গভীরে নিয়ে যাবে ভাবিনি কোনদিন।
হ্যাঁ তুমি সিপিএমের কলকাতা কেন্দ্রিক এক পরিচিত নেত্রী ছিলে এতে কোনও সন্দেহ নেই। তুমি কমরেড ইন্দ্রাণী তালুকদার হিসেবেই বেশি চেনাশোনা ছিলে সবার কাছে। দলের দক্ষ পরিশ্রমী সংগঠক হিসেবে তোমাকে তাই অনেকেই চিনতো। তবে আমি তোমাকে কমরেড ইন্দ্রাণী বলে ভুলেও একবারের জন্য ডাকিনি। আমরা পরস্পরের নাম ধরেই ডাকতাম এক সময়ে। তুমি জানতে আমি সাংবাদিক। এটাও জানতে কলম ধরলে, আমি রাজ্যের সমস্ত রাজনৈতিক দল সহ সিপিএমেরও প্রবল সমালোচক হয়ে উঠি মাঝেমধ্যে নানান ইস্যুকে কেন্দ্র করে। তাই আমাদের মধ্যে সচেতন ভাবে এক মূহুর্তের জন্যও রাজনৈতিক আলোচনা তুমি আনতে দাওনি। আমিও আনিনি।
রাতের পর রাত আমরা আলোচনা করেছি। না, এমন একটা মিনিটও আসেনি যেখানে মানব-মানবী সংক্রান্ত আলোচনা স্থান পেয়েছে উভয়ের মধ্যে। আমরা হামেশাই আলোচনা করতাম, পুরীতে চৈতন্য দেবের মৃত্যু রহস্য প্রসঙ্গে। আমরা তর্ক করতাম নবাব
সিরাজউদ্দৌলার বংশধারার রহস্য নিয়ে। কি অগাধ তোমার প্রাসঙ্গিক জ্ঞান। কত পড়াশোনা করতে তুমি বিষয়গুলো নিয়ে। কখনও প্রাচীন ভাষ্কর্য, কখনও বিশ্বখ্যাত ছবি নিয়ে আমরা কত ‘না’ ‘হ্যাঁ’ করতাম ঘন্টার পর ঘন্টা। অগুনতি রাত। ওই রাতগুলো তুমি করে তুলতে গবেষণার গ্রন্থাগার। নানা অজানাতে আমরা কখনও সহমত হতাম। আবার ভিন্নতা তৈরি হতো না এমনটাও নয়। কিন্তু পরের রাতেই তোমার কোনও নতুন তত্ত্বে ভিন্নতা ঠিক দূরে ঠেলে দিতে। এমনই ছিলে তুমি। এমনও বলতে, সিরাজের বংশধরের বিষয়ে আমি শেষ জানতে চাই। প্রয়োজনে আমরা মুর্শিদাবাদ যাবো বুঝলে। আমিও সহযাত্রী হবো বলে সম্মতি দিয়েছিলাম একসময়ে। অথচ হঠাৎ আজ রাতে আমি তোমার মৃত্যু সংবাদে কেমন যেন কুঁকড়ে গেলাম। ফেসবুক পোস্টের একটা নোটিফিকেশন দেখে ইন্দ্রাণীর নিশ্চিন্তপুরে ভ্রমণের কথা প্রথম জানতে পারলাম একটু আগে। অত্যন্ত আচমকা তাৎক্ষণিক ভাবে।
কথা তুমি বরাবর রেখে গেছ আমার কাছে। মুর্শিদাবাদে আমাদের যাওয়ার কথাটা শেষ অব্দি কিন্তু রাখলে না। এই কথার খেলাপটা আমি অন্তত তোমার কাছে আশা করিনি। জানো ইন্দ্রাণী, তুমি আমাকে রাতের অর্থ অন্য ভাবে বুঝিয়ে ছিলে। আমার গোটা জীবনে পরিচিত একমাত্র তুমি সেই নারী, যে আমাকে বুঝিয়েছিল, রাত মানে গবেষণার অনন্ত তথ্য আদান-প্রদান, রাতের অর্থ হল বিষয়ভিত্তিক জানা অজানার মত বিনিময়, রাত বলতে বোঝায় বৈশ্বিক শিল্প চেতনার অজস্র যুক্তিজালকে পরস্পর থেকে জেনে নেওয়া।
খুব তো নিশ্চিন্তপুরে একদম না জানিয়ে হঠাৎ টুক করে চুপিচুপি চলে গেলে। তা বেশ করেছো। নিয়তি বলে কথা! এবার বলো তো দেখি, এখন আমি কি করি? রাতের এহেন গবেষণা কি একা করা সম্ভব? গোটা বিশ্বে তোমার বিকল্প তো আমার জানা চেনা সত্যি নেই। আসলে বেশিরভাগ অন্যেরা রাতের অর্থ অন্য ভাবে নেয়। এখানেই তুমি আমার কাছে ছিলে একেবারে পুরোপুরি স্বতন্ত্র। ঠিকই আছে। তাই বলে ভেবো না মোটেও, তোমাকে আমি ভুলে যাব অত সহজে। একদিন তো আমাকেও যেতে হবে নিশ্চিন্তপুরে। রিজার্ভেশন টিকিটতো কনফার্মড। শুধু ডেট আর টাইমটা অ্যানাউন্স করা বাকি। তখন না হয় আবার রাতে আমাদের আলোচনা হবে, ফরাসী শিল্প বিপ্লবের নানা অজানা প্রসঙ্গ নিয়ে। কি রাজি তো?
আজ খুব খারাপ লাগছে তোমার জন্য। বিশ্বাস করো। প্রকৃতই আমরা একদিনও রাজনীতির আলোচনা করিনি। কেন বলতে পারো? আসলে আমাদের মধ্যে মনোমালিন্য হোক সেটা তুমি কোনদিন চাওনি। তাই পুরোপুরি রাজনীতি জগতের মানুষ হয়েও তুমি আমার কাছে এক মূহুর্ত রাজনীতিটা করলে না। চির বন্ধুই থেকে গেলে। সাক্ষাতে। ফেসবুকে। কোনও দিন তোমাকে কমরেড ইন্দ্রাণী বলে ডাকিনি। কিন্তু সবাই যে আজ তোমাকে স্মরণ করে কমরেড ইন্দ্রাণী তালুকদারের নামে চোখের জল ফেলছে। আমি কেমন যেন একা বোধ করছি ইন্দ্রাণী সবার থেকে। আমি আর পারছি না এটা মেনে নিতে একা একা। কি করি বলো তো? দমটা আটকে আসছে আমার। তাই স্বস্তি নিতে সবার সঙ্গে গলা মিলিয়ে প্রথমবারের মতো না হয় তোমাকে বলেই ফেলি কি বলো? ‘কমরেড ইন্দ্রাণী তালুকদার অমর রহে’। তাই হোক। চিরশয্যায় শায়িত তোমার পবিত্র নশ্বর দেহের উদ্দেশ্যে তোমাকেই তাই চিৎকার করে বলছি, “চিরবন্ধু ইন্দ্রাণী আমার, তোমাকে জানাই আমার শেষতম অন্তর কুর্ণিশ। কমরেড ইন্দ্রাণী তালুকদার আমার, তোমায় অন্তিমবারের মতো জানাই লাল লাল লাল সেলাম।”


—————-
লেখক, সুবীর পাল, এডিটর, দ্য অফনিউজ, কলকাতা।

Facebook Comments

বাংলাদেশ সময়: ৬:২৫ অপরাহ্ণ | মঙ্গলবার, ২৫ মে ২০২১

জাপানের প্রথম অনলাইন বাংলা পত্রিকা |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

হে অনন্তের পাখি

৩০ আগস্ট ২০২০