ঘোষণা

ড. মিল্টন বিশ্বাস

হে অনন্তের পাখি

অনলাইন ডেস্ক | রবিবার, ৩০ আগস্ট ২০২০ | পড়া হয়েছে 81 বার

হে অনন্তের পাখি

২৮ আগস্ট প্রয়াত হলেন সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক রাহাত খান (১৯৪০-২০২০)। তাঁর প্রয়াণে এক শোকবার্তায় রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ বলেছেন, ‘রাহাত খানের মৃত্যু দেশের সাহিত্য ও সংস্কৃতি জগতের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি।’ অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন এভাবে- ‘কর্মের মাধ্যমে মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকবেন রাহাত খান’।

একথা ঠিক মানুষ তাঁর কর্মের মাধ্যমেই স্মরণীয় হয়ে থাকেন। এদিক থেকে রাহাত খান আমাদের দেশের সাংবাদিকতা জগতে দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে জাতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ কি কি কাজ করেছেন তা ভেবে দেখা দরকার। উপরন্তু বাংলা একাডেমি পুরস্কার ও একুশে পদকপ্রাপ্ত কথাসাহিত্যিক হিসেবে তাঁর সাহিত্যের স্বাতন্ত্র্য অন্বেষণও করা যেতে পারে।

রাহাত খান ১৯৪০ সালের ১৯ ডিসেম্বর কিশোরগঞ্জের তাড়াইল উপজেলার পূর্ব জাওয়ার গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। কথাসাহিত্যিক হিসেবে সমাদৃত হলেও কর্মসূত্রে রাহাত খান আমৃত্যু সাংবাদিক ছিলেন। তিনি ১৯৬১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। শিক্ষা জীবন শেষ করে কিছুদিন জুট পারচেজ ও বীমা কোম্পানিতে চাকরি করে পরে ময়মনসিংহের নাসিরাবাদ কলেজে যোগদান করেন। সংবাদে যোগ দেবার পূর্ব পর্যন্ত ১৯৬২ থেকে ১৯৬৯ এর মধ্যে একে একে জামালপুর আশেক মাহমুদ কলেজ, ঢাকা জগন্নাথ কলেজ এবং চট্টগ্রাম কমার্স কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অধ্যাপনা করেছেন তিনি। ১৯৬৯ সালে তিনি সংবাদ থেকে দৈনিক ইত্তেফাকে যোগদান করেন।

ইত্তেফাক ছিল রাহাত খানের কর্মের অন্যতম সুন্দর জায়গা। স্বাধীনতার পরে যুদ্ধ-বিধ্বস্ত স্বদেশের কাজে একটি সংবাদপত্রের ইতিবাচক ভূমিকা তৈরিতে তাঁর অবদান রয়েছে। যদিও বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর এদেশের সংবাদপত্রগুলো স্বৈরশাসকের চাপের মুখে সুর পাল্টে ফেলেছিল; কিন্তু রাহাত খান কখনো অন্যায়কারীর কাছে মাথা নত করেননি। কিংবা আপস করে বঙ্গবন্ধুর আদর্শের বিপরীত পথে হাঁটেননি। তিনি দৈনিক ইত্তেফাকের সহকারী ও ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ২০১৩ সালে তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় দৈনিক বর্তমান।

সাংবাদিকতা জীবনের ব্যস্ততার মধ্যে রাহাত খান কথাশিল্পী হিসেবে খ্যাতিমান ছিলেন। বাংলা ছোটগল্প ও উপন্যাসের বিষয়-বিন্যাসে অভিনবত্ব এনেছেন; ভাষা প্রয়োগে ছিলেন নিপুণ কারিগর। তাঁকে কেউ কেউ কেবল নগর জীবনের কথাকার বলতে চান। কিন্তু তাঁর সৃষ্টিকর্ম পাঠ করলে দেখা যাবে সেখানে মাটি ও মানুষের কথা বলতে গিয়ে গ্রামীণ জীবনের অনুপম চিত্র দরদ দিয়ে ফুটিয়ে তুলেছেন তিনি। ১৯৭২ সালে তাঁর প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘অনিশ্চিত লোকালয়’ প্রকাশিত হয়। এরপর তাঁর উল্লেখযোগ্য প্রকাশনা হলো- ব-দ্বীপের ভবিষ্যৎ (১৯৮২), অমল ধবল চাকরি (১৯৮২), এক প্রিয়দর্শিনী (১৯৮২), হে অনন্তের পাখি (১৯৮৩), ছায়া দম্পতি (১৯৮৪), হে শূন্যতা (১৯৮৪), সংঘর্ষ (১৯৮৪), শহর (১৯৮৪), আকাঙ্খা (১৯৯৬), আমার সময় (২০০৫), ভালোমন্দ মানুষ (২০১০) প্রভৃতি।

এই গ্রন্থগুলো পাঠ করলে দেখা যায়, ধনতন্ত্র বা সমাজতন্ত্র কোনটাতেই তাঁর পরিপূর্ণ বিশ্বাস বা আস্থা ছিল না। তবে তিনি ব্যক্তি উদ্যোগ, ব্যক্তি স্বাধীনতা, নাগরিক দায়িত্ব সচেতনতা ও মানুষের মৌলিক অধিকারে বিশ্বাসী ছিলেন। তিনি বলতেন পরিবর্তনই প্রগতি, প্রগতিই জীবন। তিনি ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত গল্পই লিখেছেন। গল্পগ্রন্থ ‘অনিশ্চিত লোকালয়’ এর ‘ইমান আলীর মৃত্যু’ ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’ ‘ভালোমন্দের টাকা’ ‘অন্তহীন যাত্রা’ ‘চুড়ি’ ‘শরীর’ ‘অনিশ্চিত লোকালয়’ প্রভৃতি গল্পে ভালো-মন্দ মানুষের প্রবেশ ঘটেছে অবলীলায়। সেখানে নিষ্ঠুর মানুষ থেকে শুরু করে অপরাধী জগতের ব্যভিচারী চক্রের ভিড় লক্ষ করা যায়। সংলাপে অশ্লীল বাক্যের স্বাভাবিক ব্যবহার, ভাষায় বাস্তবতা উন্মোচনে সচেতনতা পাঠককে সহজেই মুগ্ধ করে।

পাকিস্তান আমলের বৈরি পরিবেশে প্রগতিশীল চেতনা নিয়ে সাংবাদিকতা পেশায় নিয়োজিত ছিলেন রাহাত খান। আজীবন মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় নিজেকে প্রসারিত করেছেন এদেশের শিল্প-সাহিত্যের জগতে। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ছিল তাঁর কর্মের প্রেরণা। ১৯৭৩ সালে তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কার পান। আর বঙ্গবন্ধুর আমলে ১৯৭৪ সালে বাংলা একাডেমি আয়োজিত প্রথম জাতীয় সাহিত্য সম্মেলনের তিনি ছিলেন সদস্য-সচিব। এই সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু ছিলেন প্রধান অতিথি। তিনি বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার ছাড়াও অর্জন করেন, সুহৃদ সাহিত্য পুরস্কার (১৯৭৫), সুফী মোতাহার হোসেন পুরস্কার (১৯৭৯), আবুল মনসুর আহমদ স্মৃতি পুরস্কার (১৯৮০), হুমায়ুন কাদির স্মৃতি পুরস্কার (১৯৮২), ত্রয়ী সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮৮) এবং একুশে পদক (১৯৯৬)।

সাংবাদিকতা পেশার সূত্রে তিনি বিশ্বের অনেক দেশ ঘুরেছেন। উপন্যাস ও ছোটগল্পে সেই ভ্রমণের প্রভাব পড়েছে। কাহিনি বিন্যাসে স্থানের সীমিত পরিসর অতিক্রম করে চরিত্রগুলো অনেকক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক হয়ে উঠেছে। যেমন ‘ভালোমন্দ মানুষ’ উপন্যাসে বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল ও মিয়ানমারের সন্ত্রাস ও চোরাচালান চক্রের পরিচয় পাওয়া যায়। ভারতীয় সন্ত্রাসী জয়নাল ওরফে জয়ন্ত, নলিনী এবং আন্ডার ওয়ার্ল্ডের অন্যান্য সন্ত্রাসীবৃন্দের কর্মকাণ্ড চিত্রিত হয়েছে। তবে নর-নারী সম্পর্কের রসায়নই লেখকের মুখ্য উদ্দিষ্ট ছিল আখ্যানাংশে। রাহাত খান চরিত্র রূপায়ণে সজীব বর্ণনার পক্ষপাতী ছিলেন। যেমন তিনি এই উপন্যাসের নারী চরিত্র কানিজ রেজার বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে- ‘কানিজ রেজার দেহের গড়ন পাতলা। তার বয়স ৪৪ বছর। তাকে ঢের কম বয়স বলে মনে হয়। সব সময় গোছগাছ হয়ে থাকেন। আজ পরেছেন তিনি সবুজ সিল্কের তিন প্রস্থ সালোয়ার-কামিজ। ব্রার কল্যাণে তার স্তন জোড়া উন্নত ও সুডোল দেখায়। চোখে পরে আছেন আচ্ছা কালো রঙের গগল্স।’

হেরোইন ও গাঁজা পাচারের সঙ্গে যুক্ত চরিত্র আছে এখানে। যুবসমাজকে চোরাকারবারিরা কীভাবে ফাঁদে ফেলে তারও বর্ণনা আছে। বিপথগামী যুবসমাজের আলেখ্য বর্ণনার সঙ্গে সঙ্গে হত্যা, রিরংসাজাত প্রেম এবং একইসঙ্গে শিল্পপতিদের আচরণ উদ্ভাসিত হয়েছে। তবে কেবল বহির্বাস্তবতা নয় মনোবাস্তবতার নিবিড় চিত্রও আছে রাহাত খানের উপন্যাসে। সংলাপ রচনায় ভাষা প্রয়োগে তিনি ছিলেন সিদ্ধহস্ত। আঞ্চলিক শব্দ দিয়ে কবিতা লেখার বিষয়ে তাঁর একটি চরিত্র এভাবে কথা বলেছেÑ ‘বাংলা কবিতার একটা বিপ্লব ঘটাতে হবে। আঞ্চলিক ভাষায় ভাব প্রকাশ করা সহজ হয়। শব্দগুলো প্রাণের সঙ্গে মিশে থাকে। বাংলাদেশে সবকটা আঞ্চলিক ভাষায় যদি এভাবে কবিতা লেখা হতে থাকে, তাহলে একদিন না একদিন বাংলা কবিতার রূপান্তর ঘটতে বাধ্য। আমরা বিভিন্ন অঞ্চলের কবিতা থেকে পেয়ে যাব অনেক নতুন শব্দ। বহু বৈচিত্র্যপূর্ণ বাকভঙ্গি। তবে বৈচিত্র্যের দিক থেকেও ঐশ্বর্য জোগাবে বাংলা ভাষাকে।’

‘আমার সময়’ (২০০৫) উপন্যাসে মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী স্বাধীনতা বিরোধী, রাজাকার, শান্তি কমিটির লোকদের মুক্তিযোদ্ধা সেজে সমাজে প্রভাবশালী হয়ে ওঠার কাহিনি রয়েছে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর এদেশে পাকিস্তানি ভাবধারার পুনঃপ্রবর্তন ঘটে। ফলে মানুষের মূল্যবোধে আসে পরিবর্তন। সামাজিক ন্যায় প্রত্যাখ্যাত হয়। ন্যায্যতা দূরে ঠেলে ফেলা হয়। গরিব জনগোষ্ঠী পুনরায় স্বাধীনতা বিরোধীদের দ্বারা নির্যাতিত হতে থাকে। এসবেরই চিত্র আছে এই উপন্যাসে।

রাহাত খানের উপন্যাস-গল্পে খবরের কাগজের প্রসঙ্গ ঘুরে ফিরে এসেছে। প্রকাশিত সংবাদ চরিত্রকে প্রভাবিত করেছে। তথ্য দিয়ে মনোভঙ্গি পাল্টে দিয়েছেন লেখক। সাংবাদিক হিসেবে কথাসাহিত্যে কর্মক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা চরিত্র সৃজনে প্রভাব রেখেছে। এজন্য তাঁর আখ্যানে ভালো মানুষ ও ইতিবাচক সমাজ বিনির্মাণের প্রত্যাশাও অভিব্যক্ত হতে দেখা যায়।

রাহাত খানের কথাসাহিত্যে শ্রেণিশোষণ কিংবা শ্রেণিদ্বন্দ্ব প্রাধান্য পায় নি বরং মানুষকে মানবিকতার দৃষ্টিতে দেখেছেন তিনি। আবার নর-নারীর সম্পর্কের ক্ষেত্রে শরীরী প্রেম প্রাধান্য পেলেও তিনি দেহাতীত প্রেমে তাঁর চরিত্রের মাধুর্যকে খুঁজে পেয়েছেন। জীবনে জয়ী হওয়ার মূলমন্ত্রও এই প্রেম। তবে নারী সম্ভোগের বর্ণনাগুলো শিল্পের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করেনি। কারণ শেষ পর্যন্ত মানবিক সম্পর্ক তাঁর কথাসাহিত্যের মৌল প্রবণতা। সাংবাদিক পরিচয় তাঁর কথাসাহিত্যিক পরিচয়কে কখনো ম্লান করতে পারবে না। কারণ দুটোই সৃজনশীল কর্মের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত।

লেখক : কলামিস্ট, সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রগতিশীল কলামিস্ট ফোরাম, নির্বাহী কমিটির সদস্য, সম্প্রীতি বাংলাদেশ এবং অধ্যাপক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।
drmiltonbiswas1971@gmail.com সূত্র : জাগো নিউজ

Facebook Comments

বাংলাদেশ সময়: ৬:১৩ অপরাহ্ণ | রবিবার, ৩০ আগস্ট ২০২০

জাপানের প্রথম অনলাইন বাংলা পত্রিকা |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত