ঘোষণা

স্কুল পালানো একটি মেয়ে, পঞ্চাশ বছরেও সেরার সেরা

সুবীর পাল | বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২০ | পড়া হয়েছে 138 বার

স্কুল পালানো একটি মেয়ে, পঞ্চাশ বছরেও সেরার সেরা

বেশ মনে পড়ে সেদিন বিকেলে আমার মোবাইলটা বেজে উঠেছিল। হ্যাঁ তারই সূত্র ধরে গাঁথা হয়েছিল এক সাফল্যের অপরূপ রূপকথা।

মেয়ের ক্লাস টিচারের ফোন। কৌশিকী তখন একাদশ শ্রেণির ছাত্রী। দুর্গাপুরের সিএমইআরআই’এর কেন্দ্রীয় বিদ্যালয়ের আর্টস নিয়ে তার তখন পড়াশোনা। আমি হ্যালো বলতেই স্যার জানতে চাইলেন আপনার মেয়ে আজ কি স্কুল এসেছিল? আমি বুঝে গেলাম নিশ্চয়ই কিছু অস্বাভাবিক কাজ করেছে মেয়ে আমার। এমনিতেই স্যাররা ওই স্কুলের খুব কেয়ারিং। আমি হ্যাঁ বলতেই স্যার বলে উঠলেন, সুকন্যা (আমি ওকে কৌশিকী বলি) আজ স্কুল না এসে সামনের পার্কে বেড়াতে গিয়েছিল ক্লাসের বন্ধুদের সঙ্গে। আপনি কাল স্কুলের প্রিন্সিপালের কাছে এসে দেখা করবেন।

মেয়ের এই নয়া অনিয়মের কর্ম কানে আসতেই সাংবাদিক বাবার মন অস্থির হয়ে ওঠে। ঘটনার নিশ্চয়তা জানতে আমি পার্কের এক পরিচিত কর্মকর্তাকে ফোন করি। তিনি যা বললেন তাতে আমি আরও চমকে গেলাম। তাঁর কথায় শুধু আজ নয়, দিন সাত আগেও ওরা এসেছিল এখানে। এরপর কৌশিকীকে চেপে ধরা যথারীতি। খুব ঠান্ডা মাথায় অথচ চরম গাম্ভীর্যে। সে পরিস্থিতি ঘোলাটে বুঝে সব অন্যায় স্বীকার করে ও দুই দিনে কে কে পার্কে গিয়েছিল তাও জানিয়ে দেয়।

যথারীতি অভিযুক্ত সব ছাত্রছাত্রীসহ আমরা সব অভিভাবক প্রিন্সিপালের চেম্বারে হাজির। নিজেকে চোরের মতো অপরাধী মনে হচ্ছিল সেই সময়ে। প্রিন্সিপাল জানিয়ে দিলেন আমি এদের সবাইকে টিসি দেব। তবু আপনারা নিজেদের বক্তব্য বলতেই পারেন। সমস্ত অভিভাবক এবারের মতো ক্ষমা করে দেবার আবেদন জানাতে থাকেন। সেই আর্তি শুনে প্রিন্সিপালও একটু নরম হতে শুরু করেন। ঠিক এমন পরিবেশে আমি বলতে উঠলেই পরিস্থিতি চরমে ওঠে। আমি জানালাম, আমার মেয়ে ও অন্যান্য পড়ুয়ারা এটাই প্রথম নয়, এই এই স্টুডেন্টরা দিন সাত আগে আরও একবার পার্কে গিয়েছিল ক্লাস বাঙ্ক করে। এই শুনে অন্যান্য অভিভাবকেরা আমার বিরুদ্ধাচারণ শুরু করে দেন। প্রিন্সিপালও অবাক হয়ে যান। আমি শুধু এটুকুই বললাম, “আমি জানি আমার মেয়েকে টিসি দিয়ে দেওয়া হবে। তাই বলে একজন অভিভাবক হয়ে আমি জেনে বুঝে মিথ্যের অপলাপ করতে পারবো না। আমি রাজি স্কুলের নিয়ম মেনে মেয়েকে একই অপরাধ বারবার করার জন্য যে শাস্তি দেবে তা মেনে নেব।”

আমার কথা শুনে অ্যাটেন্ডেন্স খাতা মিলিয়ে দেখেই প্রিন্সিপালও বুঝে যান আমি ভুল বলিনি। সবাই চলে গেলে আমাকে ফের প্রিন্সিপাল ডেকে পাঠান। আমি যেতেই উনি বলেন, আমি নিশ্চিত অন্য অভিভাবকেরা এটা জানলেও তা স্বীকার করতেন না। কিন্তু মেয়েকে টিসি দেওয়া হবে জেনেও আপনি আরও একটা দোষ লুকালেন না। অদ্ভুত আপনি। সত্যি কনফেস করার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। আমি আপনার মানসিকতাকে সম্মান দিয়ে বলছি এবারের মতো আমি কাউকেই আর টিসি দিচ্ছি না।

কিন্তু পরদিন স্কুল যেতেই ক্লাসের সব বন্ধুরা মেয়েকে ঘিরে ধরে। আমি কেন আগ বাড়িয়ে আগের দিনের কথা ফাঁস করেছি প্রিন্সিপালের কাছে তা নিয়ে চেপে ধরে। ওরা মেয়েকে এমন ইনসাল্ট করতে থাকে যে মেয়ে তিতিবিরক্ত হয়ে প্রিন্সিপালের কাছে টিসি ইস্যু করার চিঠি দিয়ে বসে। ফলে আবার স্কুল থেকে ফোন পেয়ে তখনই আবার স্কুলমুখী। আমি যেতেই মেয়েকে আমার সামনে ডেকে আমাকে কৌশিকীর লেখা চিঠি দেখালেন প্রিন্সিপাল। সেদিন মেয়ে কেঁদে ফেলেছিল বন্ধুদের আচরণে ও আমার সত্য প্রকাশের জাঁতাকলে। প্রচন্ড রাগী ওই প্রিন্সিপালকে দেখলাম তখন মেয়েকে সস্নেহে বলছেন, “তোমার চিঠি আমি গ্রহণ করতে পারলাম না। আমি চাই সত্যের মুখোমুখি দাঁড়াবে সারা জীবন। আর নিজের লক্ষ্য স্থির করে এগিয়ে যাবে। বন্ধুরা কেউ থাকবে না চিরকাল। থাকবে তোমার আদর্শ আর শিক্ষা। যাও নিজের ক্লাসে যাও। সেরা হবার চেষ্টা করো”

প্রিন্সিপালের এই অঘোম কথা সেরা হবার চেষ্টা করো, আমার মনে যেন গেঁথে গেল। বাবার মন যে। বিষন্নতা আঁকরে ধরেছে। অভিভাবক হয়ে সত্যের অপলাপ যেমন করতে পারি না মেয়ের অন্যায়কে লুকিয়ে প্রশ্রয় দিয়ে, তেমনি বন্ধুদের কাছে বিনা দোষে তাকে চরম হেনস্থা করাটাই বা কি করে মানি? সন্ধ্যায় ওকে ডেকে নিলাম ছাদে। শুধু আমরা দুজন। মেয়ে বলল, বাবা তোমার জায়গায় তুমি ঠিক। কিন্তু ক্লাসে আমি অতিষ্ঠ হয়ে গেছি। তাদের একটাই বক্তব্য তোর বাবাকে যেচে কে দালালি মারতে বলেছে। যা নয় তোমার নামে আমাকে অপমান করছে। আমি বললাম, এসব ইগনোর কর। আর প্রিন্সিপাল যেটা বলেছে সেই সেরাটা হয়ে দেখা। আমি আরও বললাম তুই মধ্যম মানের স্টুডেন্ট। তাই হয়তো টপার হতে পারবি না। পড়াটাই শেষ কথা নয়। যেমন পড়ছিস তেমন পড়বি। পাশাপাশি অন্য কিছুতে সেরা হয়ে দেখা। যা অন্যরা পারবে না সেরকম যে কোনও বিষয়ে সেরা হও। সেরার অর্থ যে একটাই। তা হল সবার সেরা। কোন বিষয় তা বড় নয়। ডেডিকেশনটাই আসল। এবার তো অলরেডি ক্লাসে কামাই করে ফেলেছিস। তোর নামে অভিযোগ তুই স্কুল পালানো মেয়ে। এই অভিযোগ মুছে ফেলতে হবে। সামনের বছর ক্লাস টুয়েলভে একশো শতাংশ উপস্থিত থেকে সেরার প্রাইজটা তোকে আদায় করতেই হবে। তবেই জানবি আজকের সব অপবাদ ম্লান হয়ে যাবে। কি পারবি তো এটা করতে? মেয়ে বললো, হ্যাঁ বাবা আমি এটাই করে দেখাতে চাই গোটা স্কুলকে।

ও কিন্তু ভুলে যায়নি সেদিনের অপমানের কথা। পরের বছর থেকে শুরু হল তাই মেয়ের নতুন অধ্যাবসায়। সেকি মানসিক দৃঢ়তা। সেকি চারিত্রিক একাগ্রতা। আমি নিজে হতবাক। প্রবল ঝড়। স্কুল যাবেই। তুমুল বৃষ্টি। স্কুল গেল। শরীরে জ্বর সর্দি কাশি। আমিও বললাম ছেড়ে দে। ও রাজি হল না। স্কুল যাত্রা থামায় কে? প্রচন্ড শীতে কুয়াশায় রাস্তা দেখা যাচ্ছে না। চলল স্কুল। একদিন নিম্নচাপ ঘন বাদল দিনে ক্লাসে এসে ক্লাস টিচার বললো, সুকন্যা আমি নিশ্চিত ছিলাম তুমি আসবে। একা হলেও। তাই তোমার জন্য আমার স্কুল আজ আসা। নয়তো আজ আমি স্কুল ডুব দিতাম। সত্যি সেদিন ও ক্লাসে একা হাজির ছিল। দিন, সপ্তাহ, মাস অবশেষে সারা বছর হাজির ছিল নিজের ক্লাসে। প্রতিদিনই। বন্ধুদের ফের ইয়ার্কি, প্রাকৃতিক চরম দুর্যোগ, অসুস্থ শরীর ও সামনে পরীক্ষা আছে বলে শিক্ষকদের ঘরে পড়ার পরামর্শ, কোনও কিছুই ওকে টলাতে পারেনি সেদিন। এক অদ্ভুত লক্ষ্যে সেদিন যে সে অবিচল। লক্ষ্যটাই যেন তার একমাত্র পাখির চোখ।

অবশেষে এলো সেই সেরা স্বীকৃতি প্রদানের মাহেন্দ্রযোগ। বছর শেষে বার্ষিক অনুষ্ঠানে তাকে মঞ্চে ডেকে নিলেন প্রিন্সিপাল। মাথায় হাত বুলিয়ে মেয়ের হাতে তুলে দিলেন উপস্থিতির জন্য সেরা পুরস্কার। গোটা প্রেক্ষাগৃহে যেন সেই মুহূর্তে হাততালির ঝড় উঠেছে। অথচ সে কি নির্লিপ্ত কি উদাসীন। আস্তে আস্তে আমার কাছে এসে বললো মেয়ে আমার, এই নাও সার্টিফিকেট। আমি পারলাম তো বাবা। আমার চোখে তখন মৃদু অশ্রুধারা। বুকে জড়িয়ে ওকে বললাম, সেদিন আমি একটা সত্যি বলেছিলাম প্রিন্সিপালকে। আমার সেই সত্যের জন্য তুই তখন ছোট হয়ে গিয়েছিলিস। আজ তুই আমাকে সেরা হবার সত্যটা ফিরিয়ে দিলি। এখন যে আমি গর্বিত বাবা। মেয়ে সেই শুনে তখনই বলেছিল, তুমি সেদিন সত্যের সামনে ছিলে বলেই আজ আমি এই সার্টিফিকেট পেলাম। নাতো এটা পেতাম না বাবা।

এসব বছর দুয়েক আগেকার কথা। তবে আজ এসব কথা কেন বলছি? এমন প্রশ্ন আসতেই পারে। অবশ্যই আজকের এই স্মৃতিচারণের যুক্তি আছে বৈকি। ওই স্কুলের পঞ্চাশ বছর পূর্তি চলতি বছরে। এই অর্ধশত বছরের মধ্যে কৌশিকী একমাত্র ওই স্কুল পড়ুয়া যে দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়াকালীন একশো শতাংশ উপস্থিত থেকেছে। একদিন এই স্কুল পালানো ওই মেয়েটা, একদিন বন্ধুদের গঞ্জনায় টিসি আবেদনকারী এই মেয়েটা পঞ্চাশ বছরের একক রেকর্ডটা এখনও পর্যন্ত নিজের কাছেই অক্ষত রেখে দিল। অন্যকারও স্পর্শহীন অবস্থায়। শুধু সেরা হয়ে নয়। পঞ্চদশ বছরের সেরার সেরা হয়ে। ব্রাভো কৌশিকী ব্র্যাভো। সামনের দিকে এগিয়ে চল। আবার সেরা হবার সাধনায়…

লেখক: সম্পাদক, অফ নিউজ, কলকাতা।

Facebook Comments

বাংলাদেশ সময়: ৮:৪৫ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২০

জাপানের প্রথম অনলাইন বাংলা পত্রিকা |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

হে অনন্তের পাখি

৩০ আগস্ট ২০২০