ঘোষণা

নাদিয়ার সাথে একদিন

আহসান গাজী | রবিবার, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২১ | পড়া হয়েছে 78 বার

নাদিয়ার সাথে একদিন

হ্যালো আর কতক্ষণ লাগবে।
এইতো বাবা নামছি আর পাঁচ মিনিট। ওপাশ থেকে নাদিয়া বল্লো।
রাতুল রাত চারটা বাজে নাদিয়ার বাসার নিচে দাঁড়িয়ে আছে। অনেক কষ্টে সে নাদিয়ার কাছে একটা দিন চেয়ে নিয়েছে। প্রতিটা মুহূর্ত তার কাছে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সব অপূরর্ণতা আজকেই পূরন করতে হবে।
নাদিয়া নিচে নেমে এলো। রাগান্বিত কন্ঠে বলল, এখন কয়টা বাজে?
রাতুল কিছু না বলে মাথা নিচু করে মাটির দিকে তাকিয়ে থাকে।
কিছু বলছো না কেন? নাদিয়া প্রশ্ন করে।
বাদ দেওনা এখন এসব। এসে যখন পড়েছি, চলো না আমরা দু’জন মিলে সময়টা উপভোগ করি।
রাতুল ঘুম বাদ দিয়ে এখানে এসেছে সে সময় উপভোগ করতে। বিষয়টা নাদিয়ার কাছে ততটা ভালো লাগছিল না। তারপরেও রাতুলের অনুরোধ যেন সে ফেলতে পারে না। তাই তারা দু’জন পাশাপাশি একসাথে হাঁটতে থাকে। পুরো রাস্তা জুড়ে তখন ওরা শুধু দু’জন। দুই একটা রাস্তার কুকুর ছাড়া পুরো রাত্রিজুড়ে নির্জনতা। নির্জনতা ভেঁঙ্গে রাতুল বলল, আজকের চাঁদটা দেখতে কতো সু্ন্দর, তাই না?
হুম সুন্দর।
আজকের রাতটা আমার জীবনের সেরা রাত হয়ে থাকবে। অনেক রাত আমি রাস্তায় একা হেঁটে পাড় করেছি। কখনও ফ্রেন্ডদের সাথে। সবকিছু মিলিয়ে আমার কাছে এই রাতটা বেশিই সুন্দর, কারণ তুমি আমার সাথে আছো। রাতুল একটানা কথাগুলো বলে যায়।
নাদিয়া ছোট করে উত্তর দেয়, হুম। একটা জিনিষ খেয়াল করেছো? পুরো আকাশে শুধু দুইটা তারা। তাও একসাথে। ওরাও কি আমাদের নিয়ে গল্প করছে? হয়তো তাই হবে। কিন্তু কি বলছে ওরা আমাদের নিয়ে?
হয়তো সবসময় দু’জন দু’জনের পাশে থাকার বিষয়ে অঙ্গীকার করছে। এ সময় একটা তারা হঠাৎ করেই দূরে কোথাও ছুটে চলে যায়।
কেউ কারো পাশে থাকার বিষয়টি মনে হয় মানুষের হাতে নেই। পুরোটাই সময় আর ভাগ্যের বিষয়, তাই না?। নাদিয়া এক নিশ্বাসে কথা গুলো বলে।
ওরা হাঁটতে হাঁটতে একটা নদীর পাড়ে এসে দাঁড়ায়।
পুব আকাশে তখন মাত্র লাল সূর্য উকি দিতে শুরু করছে। নাদিয়া একটা বড় নিঃশ্বাস নিয়য় বলল, আমি এর আগে কখনও নদীর পাড়ে সুর্যোদয় দেখি নাই। আজই প্রথম দেখছি। সত্যি দেখতে অনেক ভালো লাগতাছে আমার।
রাতুল দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নাদিয়াকে দেখে। ওর উচ্ছলতা রাতুলকে পাগল করে দেয় যেন। নাদিয়ার মায়াবি চোখের দিকে তাকিয়ে রাতুল ভাবে, সারাজীবন ওঁকে এ। ভাবেই আগলে রাখবে। এভাবে পাশে থেবে ওর আনন্দের উৎস্য তৈরি করবে।
মামা দেরি হইয়া গেছে নাকি? একটা লোকা সামনে এসে রাতুলকে উদ্দেশ্য করে বলে। লোকটির কথায় রাতুলের ভাবনায় ছেদ পড়ে।
কিছু মনে কইরেন না মামা, চা জোগাড় করতে দেরি হইয়া গেছে। মাঝ বয়সি একটা লোক ওদের সামনে এসে দাঁড়ায়।
না মামা, আমরাই আগে আইসা পরছি।
নাদিয়া এতক্ষণ সবকিছু চুপ করে শুনছিল। উনি কে? নাদিয়ার প্রশ্ন।
উনি হচ্ছেন আমার আওয়াল মামা। মামা নৌকা চালান। ওনার নৌকাতেই এখন আমরা ঘুরে বেড়াবো।
নাদিয়া অনেকটাই অবাক হয়ে প্রশ্ন করে, মানে?
লোকটি প্রশ্ন করে, মামা, চা কি এখন খাবেন নাকি নৌকায় উইঠা খাইবেন?
আমরা পরে খাবো আপনি আগে খাইয়া নেন। রাতুল বলল।
আমি খাইয়া আইছি আপনেরা নৌকায় ওঠেন।
রাতুল নাদিয়াকে তার হাত ধরে নৌকায় উঠতে সহযোগিতা করে। এরপর ওরা একসাথে পাশাপাশি নৌকায় বসে। বসে মাঝির কাছে চা চেয়ে নিয়ে চা খায়।
নাদিয়া। রাতুল নাদিয়াকে ডাকে।
নাদিয়াও ছোট করে উত্তর দেয়, হুম।
রাতুল কথা ঘুরাতে বলল, না কিছু না।
নাদিয়া হেসে হেসে বলল তুমি একটা আস্ত ছাগল।
নৌকা ভাসায় মাঝি। পানিতে বৈঠা লাগালে পানির শব্দ হয়। সেই শব্দে রাতুলের মনে কবিতা উঁকি দেয়। এসময় নাদিয়াকে রাতুলের অনেক কিছু বলার ইচ্ছে করে কিন্তু সে কিছুই বলতে পারে না আবেগাপ্লুত হয়ে। মনের ভিতর জমানো কথাগুলো সব হঠাৎ করেই হারিয়ে যেতে থাকে যেন তখন।
সকালের আলোয় চারিদিক পরিষ্কার। কি লাভ এসব করে বলো? নাদিয়া বলে।
রাতুল আকাশের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, জানিনা। অনেক সময় নৌকায় তারা দু’জন ঘুরে এবার বাসায় ফেরার পালা। নৌকা থেকে নেমে ওরা একটা রিক্সা নেয়। রিক্সায় উঠার পর রিক্সাওয়ালাকে তাদের গন্তব্যের কথা বলে। তার আগে কোনো কিছু বলে উঠেনি রিক্সায়। আজই প্রথমবারের মতো ওরা একসাথে রিক্সায় উঠেছে। রাতুল মনে মনে ভাবে আসলে আজকে যা কিছু হবে সবই হবে তার জীবনে প্রথমবারের মতো আর এটাই হয়তো হবে তার জীবনে শেষবার।
রিক্সা ওদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসির দিকে যায়। যাওয়ার সময় রাতুল বেশ কিছু চকলেট কিনে নেয় তাদের জন্য। ওরা টিসসির ছিন্নমূল বাচ্চাদের দেখে ওদের চকলেটগুলো দেয়। অনেকটা সময় ওরা ওদের সাথে কথা বলে আর রসিকতা করে কাটায়।রাতুল ওদের জীবনের গল্প শোনে। তাদের সবারই একটা জিনিস কমন, তা হচ্ছে দারিদ্রতা কিন্তু একেকজনের কষ্ট যেন একেক রকম।দারিদ্রতার মধ্যেও কষ্টের এতটা ভিন্নতা থাকতে পারে তা জানা ছিল না রাতুলের। অনেকটা সময় সেখানে কাটিয়ে ওরা টিএসসি থেকে বের হয়ে আবার পাশাপাশি রমনার দিকে হাঁটতে থাকে। এসময় হঠাৎ করেই আকাশ মেঘলা হয়। বৃষ্টি নামবে মনে হয়। নাদিয়া বলল। নাদিয়ার কথা শুনে রাতুল জিজ্ঞেস প্রশ্ন করে, চলো আজকে বৃষ্টিতে ভিজি। ভিজবা?
নাদিয়া হাসি হাসি করে বলল, হুম, তোমার খেয়ে আর কোনো কাজ নেই। এখন বৃষ্টিতে ভিজি পরে শেষে ঠান্ডা লাগিয়ে বিছানায় পড়ে থাকি?
একদিন ভিজলে কি হবে? অনেকদিন বৃষ্টিতে ভিজি না। অনেক জোরাজোরির পর নাদিয়া ভিজতে রাজি হয়। একটু পরেই ঝুম বৃষ্টি শুরু হলো, দু’জন একসাথে বৃষ্টিতে ভিজতে শুরু করে। নাদিয়া গুন গুন করে বারিশ গান গায়। আর রাতুল ভাবে নাদিয়ার জীবনের সকল কালো মেঘগুলো যদি সে এভাবে সরিয়ে দিতে পারত, তাহলে নিজেকে সার্থক ভাবতে পারতো। কিছুক্ষণ পরেই একদল দুষ্ট ছেলে ভিজতে রাস্তায় নামে। রাতুলরাও আনন্দ করতে ওদের সাথে বৃষ্টিতে ভিজে।
এরপর নিরুদ্দেশ হেঁটে সময় পাড় করে ওরা। দশটা বাজলে রাস্তার ধারে দোকান পাট খোলে। ওরা একটা মার্কেটে গিয়ে জামাকাপড় কিনে একটা রেস্টুরেন্টে বসে একসাথে নাস্তা করে। এভাবেই বিচ্ছিন্ন ঘুরে পুরো দিন কাটিয়ে দেয় দু’জন। সন্ধ্যার দিকে ওরা বাসার দিকে রওনা দেয়। বাসায় যাবারর পথে রাতুল বলে, সকালে নৌকায় জানতে চাইলে না এসব করে কি লাভ, তোমার সাথে ঘুরে আমি আগামী দিনের জন্য স্মৃতি জমাচ্ছি। যতদিন আমি আছি এই স্মৃতি নিয়েই থাকবো ।
আর টিএসসির ব্যাপারটা?
রাতুল টিএসসির বিষয়ে বলতে যায় কিন্তু মাঝপথে নাদিয়া থামিয়ে দিয়ে বলে, থাক আর বলতে হবে না। নাদিয়াকে এরপর তার বাসায় পৌছে দিয়ে রাতুল তার বাসায় চলে আসে। এসময় তার বন্ধু নাঈমের ফোন আসে।
ফোন রিসিভ করেই রাতুল বলল, হ্যাঁলো নাঈম!
রাতুল, কই তুই?
কেনো রে? কি হয়েছে? আমি তো এখন আমার বাসায়।
তাড়াতাড়ি স্কয়ার হাসপাতালে আয় নাদিয়া অসুস্থ। তাকে এম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে এনে ভর্তি করা হয়েছে।
রাতুল সেই অবস্থায়ই বাইরে এসে রিক্সা নিয়ে দ্রুত হাসপাতালে যায়। কিন্তু ততক্ষনে তার কিছুটা দেরি হয়ে গেছে। নাদিয়া ক্যান্সারের শেষ স্টেপে ছিল তখন। রাতুল এর কিছুই জানতো না। তাকে বলার প্রয়েজন মনে করলেও বিষয়টি রাতুল সহজভাবে মেনে নিতে পারবে না মনে করে কখনও বলেনি। এমনকি এজন্যই নাদিয়া কোন গভীর সম্পর্কে জরাতে চায় নি রাতুলের সাথে।
নাদিয়ার এভাবে চলে যাওয়ায় রাতুল ভেঙ্গে পড়ে। কাউকে কিছু বলতে পারছিল না। শুধু মনে মনে ভাবে, নাদিয়ার জন্য অপেক্ষার প্রহর গোনা তার শেষ হলো। রাতুল শেষ বারের মত নাদিয়ার সাথে কথা বলতে পারলো না। এমনকিআত্মীয় নয় বলে সে তার লাশটা পর্যন্ত দেখতে পেল না। কারণ প্রেমিকার লাশের অধিকার এ সমাজে প্রেমিকের যে নেই।

Facebook Comments

বাংলাদেশ সময়: ৩:৩৫ পূর্বাহ্ণ | রবিবার, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২১

জাপানের প্রথম অনলাইন বাংলা পত্রিকা |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

চন্দ্রাবলী

১৬ নভেম্বর ২০২০

এডুকেশন

২৩ ডিসেম্বর ২০২০

মালতি

২৫ জুলাই ২০২০

অনুগল্পঃ মানুষ

১০ ডিসেম্বর ২০২০

 ফুটপাথ

৩০ জুলাই ২০২০

বাটপার

১৩ আগস্ট ২০২০

স্বর্গ থেকে বিদায়

০৯ ডিসেম্বর ২০২০

কারিগর

২৪ জানুয়ারি ২০২১

চারাগাছ

২৬ জানুয়ারি ২০২১

সোনাদিঘি

১৪ জুলাই ২০২০

মেষপালক  মুসা মিয়া

০৪ জানুয়ারি ২০২১

বিটলবণের স্বাদ

২৪ সেপ্টেম্বর ২০২০