ঘোষণা

দ্বিতীয় পর্ব

সিলেটের জাফলং ভ্রমণ এবং রথ দেখা ও কলা বেচা

আসাদুজ্জামান জুয়েল | শুক্রবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২০ | পড়া হয়েছে 501 বার

সিলেটের জাফলং ভ্রমণ এবং রথ দেখা ও কলা বেচা

আমাদের গাড়ি চলতে চলতে গভীর রাতে গিয়ে পৌঁছায় সিলেট শহরের কাছাকাছি। রাত যেহেতু গভীর তাই শরীরও বেশ ক্লান্ত। একটু গা এলিয়ে না দিলে শরীর মন রিচার্জ হবে না। ভ্রমণে শরীর-মন সর্বদা সতেজ থাকা চাই। এত রাতে আর কোন দিকে মুভ না করে সিলেটেই বাকি রাতটুকু কাটিয়ে দেয়া উত্তম ভেবে ছুটছি শহরের দিকে। এর আগেও একবার সিলেট গিয়ে আমরা উঠেছিলাম হিল টাউন হোটেলে। নতুন হোটেল, তিন তারকা বিশিষ্ট বলছে ওরা। সেই বার বেশ ভালই থেকেছিলাম ওখানে। আগে যেহেতু ছিলাম তাই এবারও ভাবলাম হিল টাউনেই যাই। হোটেলে পৌঁছাতে কোন সড়ক ধরলে ভালো হবে চিন্তায় পড়ে গেলাম আমরা। গভীর রাত। কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করার সুযোগ নেই। রাস্তাও আমরা চিনি না। আবার গুগলের আশ্রয় নিলাম। গুগল মামা সব জানে। কিন্তু একটু ঘুরিয়ে পেচিয়ে জানায়। শরীয়তপুর থেকে ঢাকা যেতে জাজিরা হয়ে মাওয়া সড়ক ধরলে সহজে যাওয়া যায় সেটা আমরা সবাই জানি। কিন্তু গুগল হয়তো বলে বসবে তোমরা শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জ উপজেলার আলুবাজার-হরিণাঘাট ফেরি পার হয়ে চাঁদপুর দিয়ে দৌড়াও! এই যা সমস্যা। তবুও এত রাতে কাকে আবার জিজ্ঞেস করবো তাই গুগল ম্যাপ চালু করলাম। আবারও সেই ঘুরিয়ে পেচিয়ে আমাদের গাড়ি নিয়ে গেলো সিলেটের হিল টাউন হোটেলে। গাড়ি পার্ক করতে করতে আমি আর শামীম সরদার উঠে গেলাম হোটেল রিসেপশনে। গিয়ে দেখি নাইট গার্ড ছাড়া আর কেউ নেই। সবাই ঘুমের রাজ্যে চলে গেছে। আর যাওয়ারই কথা। কার এত সখ আমাদের মতো রাত জাগার? গার্ড রিসেপশনের লোক ডেকে নিয়ে আসলো। রুমের কথা বলতেই তারা আকাশ ছোঁয়া দাম চাইছে। দাম শুনে মনে হচ্ছে করোনার কারনে যে লস হয়েছে এবং হোটেলে গেষ্ট হয়নি তা আমাদের দিয়ে পুষিয়ে নিবে। তবুও আমরা বললাম যে, রুমগুলো আগে দেখানো হোক। লোকটা আমাদের নিয়ে দেখালো থ্রি বেডের একটা রুম। রুমের অবস্থা দেখে মনে হয় কোনো হাসপাতালে ঢুকেছি! তিনটা সিঙ্গেল বেড সাড়ি সাড়ি সাজিয়ে রাখা হয়েছে। দেখে বেশ বিরক্ত হলাম আমরা। বললাম একটা ডাবল ও একটা সিঙ্গেল বেডের এসি রুম দেখান। এবার নিয়ে গেলো যেটায় সেটা মোটামুটি বলা যায় যা দিয়ে রাত পার করা যাবে। কিন্তু দর-দামের সময় তারা যা চাইছে তাতে কিডনি কলিজা চাইলেও মনে হবে ভাড়ার চেয়ে কম কিছু চেয়েছে! দর-দামে বনিবনা হলো না আমাদের। অগত্যা আমরা বেরিয়ে গেলাম নিচে। গাড়িতে উঠে দিলাম টান। আমাদের শেষ গন্তব্য যেহেতু গোয়াইনঘাট তাই চিন্তা করলাম গোয়াইনঘাট গিয়ে একটা হোটেল নিয়ে একটু বিশ্রাম নেব। যেই ভাবা সেই কাজ। গাড়ি টান দিয়ে চলতে শুরু করলাম আবারও।
আবারও সেই গুগলের সহায়তা নিয়ে শহর ছাড়ার চিন্তা করতেই আমাদের রাস্তা দেখিয়ে দিলো গুগল ম্যাপস। গুগল ম্যাপস চালু রাখলে মোবাইলের ব্যাটারি লেভেল সাই সাই করে নামতে থাকে। মোবাইলের ব্যাটারি খাওয়া দেখে মনে হচ্ছে ব্যাটারিতে চুমুক দিয়ে চার্জ পিয়া খাচ্ছে। কিছুদূর যাওয়ার পর আমার মোবাইলের ব্যাটারি লেবেল বিপদ সংকেত দেখাতে শুরু করলো। গুগল ম্যাপসের দোষ নয়, সবাই দোষ দিলো আমার মোবাইলের বয়সের। বয়স হয়েছে কম না। তিন বছর হয়ে গেছে আমার হাতে। আর কত? বয়সের ভারে এখন আর পারছে না তাই চার্জ দ্রুত কমে যাচ্ছে বললো সবাই। আমরা যেহেতু সিলেট টু গোয়াইনঘাট সড়কে চলছি তাই ভাবলাম এবার মোবাইল থেকে গুগল ম্যাপস এ্যাপসটাকে স্টপ করে দেই। এবার আমাদের গাড়ি চলছে রাস্তা দেখে, ম্যাপস দেখে নয়।

আমাদের গাড়ি সুন্দর রাস্তা ধরে এগিয়ে যাচ্ছে। পাথরের ঢালাই করা রাস্তা। অত্যন্ত প্রসস্ত চকচকে নতুন রাস্তা। খুব একটা আকা বাকা নয়, একদম সোজা রাস্তা। রাস্তার দুই ধারে বিশাল বিশাল বিল-বাওর। মাঝে মাঝে দু’একটা ছোট খাটো বাজার পড়ছে চোখে। কোথাও কোথাও দু’একটা বাড়িও দেখা যাচ্ছে। আমরা দুর্বার গতিতে এগিয়ে যাচ্ছি। রাস্তা দেখে এবং মাঝে মাঝে ব্রিজগুলো দেখে শামীম সরদার ধারণা দিচ্ছে রাস্তাগুলো প্রতি কিলোমিটার করতে কেমন খরচ পড়েছে, ব্রিজগুলোর জন্য কেমন টাকা বরাদ্দ পেয়েছে। আসলে মুচির নজর জুতার দিকে, রাজার নজর সিংহাসনের দিকে আর ঠিকাদারের নজর ব্রিজ-রাস্তার দিকে। এ কারনেই ঠিকাদার শামীম সরদার যেখানেই নতুন কোনো রাস্তা দেখলে বা রাস্তার কাজ চলছে দেখলে, কোথাও নতুন ব্রিজ দেখলে বা ব্রিজের কাজ চলতে দেখলে আমাদের ধারণা দিচ্ছে কেমন বাজেট আছে এই কাজে! নতুন নির্মিত রাস্তা। চকচকে ঝকঝকে দেখতে ও চলতে খুবই মজা। মাঝে মাঝে দু’এক কিলোমিটার বা কোয়াটার কিলোমিটার রাস্তা ফিনিশিং দেয়া হয়নি। কোথাও কোথাও ব্রিজের এপ্রোচ ঠিক করা হয়নি। আমরা রাস্তা ধরে ছুটে চলার মাঝে দেখি একটা পুলিশের গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। আমাদের কোনো প্রকার বাধা না দেয়ায় এবং না থামানোতে আগের গতিতেই গাড়ি চালিয়ে তাদের পাশ কেটে চলে গেলাম। যেতে যেতে দূরে দেখা যায় আলোক সজ্জার মতো বাতি জ্বলছে। অসাধারণ দৃশ্য যা নিজ চোখে না দেখলে বুঝানো যাবে না। ঝলমল করছে আলো। দেখে এটুকু বুঝা যাচ্ছে যে পাহাড়ের গায়ে আলোর ঝলকানি। দূর থেকে দেখলে মনে হয় সামনের আকাশে একঝাক তাঁরা জ্বল জ্বল করছে। এ যেন ঝাকে ঝাকে তাঁরার মেলা। কিন্তু ভালো ভাবে লক্ষ্য করলে বুঝা যায় পাহারের গায়ে জ্বলছে। আলো দেখে আমরা চিন্তা করছি হয়তো এখনও সিলেটেরই কোথাও আছি। সহযাত্রী একজন বললো, এটা মনে হয় হযরত শাহ পরানের মাজার শরীফ। সিলেট শহরে হযরত শাহ জালালের মাজার। ভাগ্নে শাহ পরানের মাজার মামার মাজার থেকে একটু দূরে। এটাই হয়তো হযরত শাহ পরানের মাজার শরীফ তাই এতো আলো জ্বলছে। কিন্তু আমরা পরক্ষণেই দ্বিধায় পড়ে গেলাম, কিছু দূর পর পর এতো আলোর ফোয়ারা কেন? হযরত শাহ পরানের মাজার হলে এক জায়গায় আলোকিত দেখা যাবে। কিন্তু সামনে তো দেখা যাচ্ছে থেকে থেকে বিশাল এলাকা নিয়ে আলোর খেলা। আলোর রূপ দেখে দেখে সামনে এগুতে থাকলে দেখি রাস্তা শেষ। রাস্তার দুই পাশে ছোট বড় অফিসের মতো ভবন। রাস্তার সামনেই একটা বড় সাইনবোর্ড দেয়া আছে। লেখা আছে, থামুন, সামনে ভারত, ভোলাগঞ্জ স্থল বন্দর, কোম্পানিগঞ্জ, সিলেট। আমরা থেমে গেলাম। তাজ্জব হয়ে গেলাম সবাই। যাবো গোয়াইনঘাট, চলে এসেছি ভোলাগঞ্জ। সবাই নেমে গেলাম। চারদিক শুনশান নিরব। একটু ভয় ভয়ও লাগছে। নেমে এবার কাছ থেকে দেখলাম চেরাপুঞ্জির পাহাড়ের আলোর ঝলকানি।

চলবে…

লেখক: আসাদুজ্জামান জুয়েল: আইনজীবী, কলামিস্ট, কবি, ও ভ্রমণ পিপাসু লেখক।

প্রথম পর্ব পড়ুন

সিলেটের জাফলং ভ্রমণ এবং রথ দেখা ও কলা বেচা

Facebook Comments

বাংলাদেশ সময়: ৪:৪৫ অপরাহ্ণ | শুক্রবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২০

জাপানের প্রথম অনলাইন বাংলা পত্রিকা |