ঘোষণা

সমুদ্র ও পাহাড়ে প্রকৃতির নৈসর্গিক হাতছানি

আলম শামস | রবিবার, ০৩ অক্টোবর ২০২১ | পড়া হয়েছে 80 বার

সমুদ্র ও পাহাড়ে প্রকৃতির নৈসর্গিক হাতছানি

সমুদ্র ও পাহাড়কে ভালোবাসেন না এমন লোক খুঁজে পাওয়া মুশকিল। প্রকৃতির নৈসর্গিক রূপে গড়া পাহাড় কিংবা সাগরপাড় ভ্রমনে যে কেউ বিমোহিত হবে। সমুদ্রের সুরেলা ভাষা,রূপবৈচিত্র্য দেখে মুগ্ধ হয় পর্যটক। সাগরের উত্তাল ঢেউ ভিজিয়ে দেবে শরীর ও মন, দিনের শেষে সূর্যের অস্তমিত দৃশ্য মোহিত করবে ভ্রমন বিলাসীর হৃদয়। আবির রাঙা আলো আর মুক্ত বাতাসে বুক ভরে নিঃশ্বাস নিতে কার না ভাল লাগে! সাগরের উতলা হাওয়া বুকের ভেতর জমে থাকা দীর্ঘশ্বাসের কষ্ট ভুলিয়ে দেবে। হ্যাঁ, চট্টগ্রামের পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতের কথাই বলছি! প্রকৃতির নৈসর্গিক হাতছানির সঙ্গে সমুদ্রের উত্তাল ঢেউয়ের উন্মাদনা, সবুজে ছাওয়া পাহাড়ের মৌনতা সৈকতটিকে ভিন্নরূপ দিয়েছে। সবুজ কার্পেটে মোড়ানো পাহাড়ের শান্ত রূপ মনে শান্তির পরশ বুলিয়ে দেয়। এখানে সমুদ্রের সঙ্গে কর্ণফুলী নদীটির মিলন ঘটেছে। সাগর আর পাহাড়ে ঘেরা চট্টগ্রামে আমার বোনের বাসা। নগরজীবনের ব্যস্ততা, যানজট, কোলাহলময় কর্মব্যস্ততা ছেড়ে পাড়ি জমাই প্রকৃতির আপন হাতে সাজানো চট্টগ্রামে।যান্ত্রিকতা ছেড়ে প্রকৃতির সান্নিধ্যে সরস রূপে নিমগ্ন হয়ে মুক্তির স্বাদ আস্বাদনে বেরিয়ে পড়ি। দুপুর থেকে বিকেল,বিকেল থেকে সন্ধ্যা কেটেছে রাস্তায় পথ চলতে চলতে। প্রকৃতির অপরূপ সাগরে হারিয়ে বার বার খুঁজে ফিরছি নিজেকে।সবুজে ঘেরা মৌন পাহাড়রাজি, প্রাণো”ছল সাগরের কল্লোল ধ্বনি, কর্ণফুলীর কলতান, হাজার বছরের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির বিপুল বৈভবে ঐশ্বর্যশালী চট্টগ্রাম। এ নগরে প্রাকৃতিক ঐশ্বর্যের আকর্ষণে ছুটে এসেছেন এশিয়া-ইউরোপ-আফ্রিকার নাবিকরা, এসেছেন ভ্রমণপিপাসু পর্যটক। কেউ কেউ আবার প্রকৃতির রূপে মুগ্ধ হয়ে বাঁধা পড়েছেন এখনকার জীবন ও জীবিকার সঙ্গে, ঘর বেঁধে সংসারী হয়েছেন। দেশী-বিদেশী বিভিন্ন ধর্ম-বর্ণ-গোত্রের মানুষের ভাষা, রীতিনীতি,সংস্কৃতি, চাল-চলন এ নগর ও নগরবাসীকে করেছে ঐশ্বর্যশালী।বিচিত্র সংস্কৃতির জীবনগাথা চট্টগ্রামের পরিচিতিকে এক ব্যতিক্রম মর্যাদা দিয়েছে। এ ছাড়া পর্যটন নগরী হিসেবে চট্টগ্রামের আলাদা ঐতিহ্য রয়েছে।

ভ্রমণ পিপাসুদের কাছে চট্টগ্রাম নগরীর প্রিয় স্হান হচ্ছে পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত। চট্টগ্রাম শহরের জিরো পয়েন্ট থেকে ১৪কিলোমিটার দক্ষিণে এ সমুদ্র সৈকত। এর কাছাকাছি রয়েছে শাহ আমানত বিমানবন্দর, শহর থেকে এর দূরত্ব প্রায় ২২ কিলোমিটার।প্রতিদিন শত শত দর্শনার্থীর পদচারণায় মুখরিত থাকে এ সৈকতটি। এখানে দাঁড়িয়ে বন্দরের বহিনঙরে অপেক্ষমাণ জাহাজগুলো দেখা যায়। সন্ধ্যা নামলে সমুদ্রের বুকে একটি আলো ঝলমলে শহরের মতো মনে হয়। পতেঙ্গা সৈকতে সূর্যাস্তের দৃশ্যও অবর্ণনীয় সুন্দর। দুই পাশে পাহাড়, এক পাশে নদী ও অন্য পাশে সাগরের গভীর জলরাশি। কর্ণফুলীর মোহনা, পৃথিবীর সুন্দরতম এক নদীর মোহনা। এ পাড়ে বিমানবন্দর আর নেভাল। আর ওপাড়ে দেয়াং পাহাড়, মরিয়ম আশ্রম আর মেরিন একাডেমি। ভ্রমণপিপাসুরা পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতে শুধু অপরূপ সাগর সঙ্গম দেখে মুগ্ধ হন না। আরও শুনতে পান প্রাণোচ্ছল সাগরের কলকল ধ্বনি, নীল জলরাশির উত্তাল ঢেউ। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পতাকাবাহী নোঙর করা জাহাজের সারি নয়নাভিরাম দৃশ্যের সৃষ্টি করে। পৃথিবীতে এরকম সৌন্দর্যে ভরপুর দ্বিতীয় কোনো নদীর মোহনা খুঁজে পাওয়া দুষ্কর।কর্ণফুলীর নদীর নামকরণের ইতিহাস লোকমুখে প্রচলিত রয়েছে। সংক্ষেপে– আদিবাসী এক রাজপুত্রের প্রেমে পড়েন আরাকানের রাজকন্যা। এক জোছনা ঝলমলে রাতে তারা নৌ-ভ্রমণে বের হন। নদীর স্বচ্ছ পানিতে চাঁদের প্রতিফলন দেখার সময় রাজকন্যার কানের ফুল পানিতে পড়ে যায়। ফুলটি হারিয়ে উতলা রাজকন্যা তা উদ্ধারের জন্য পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়েন। প্রবল সোতের টানে রাজকন্যা ভেসে
যান। তার আর খোঁজ পাওয়া যায়নি। রাজপুত্র তখন রাজকন্যাকে বাঁচাতে পানিতে লাফ দেন। কিন্তু তাকে বাঁচাতে ব্যর্থহন।রাজকন্যার শোকে কাতর রাজপুত্র পানিতে ডুবে আত্মাহুতি দেন। এ করুণ কাহিনী থেকে নদীটির কর্ণফুলী নামকরণ হয়।

কর্ণফুলীর এ বিরল মোহনার অদূরে পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত। দিগন্ত প্রসারিত সমুদ্রের সফেদ জলরাশি আর সাগর তীরে আছড়ে পড়া উন্মাদ ঢেউয়ের মাতম এখানে বেড়াতে আসা পর্যটকদের হৃদয়ে তোলপাড় সৃষ্টি করে, করে আনমনা। আবার কাউকে ভাবুক করে তোলে। সাগর সঙ্গম মিলন মোহনা দেখতে চলে যান পতেঙ্গা। কর্ণফুলী নদী আর বঙ্গোপসাগর যেখানে মিশেছে, সেখানে তাকালেই বোঝা যায় পানির পার্থক্য। সাগর সঙ্গমের অনির্বাচনীয় রূপ নিজের চোখে না দেখলে বলে বোঝানো যাবে না। রাতের বেলা নেভাল একাডেমী সংলগ্ন কর্ণফুলী পাড়ের নেভাল সৈকত থেকে কর্ণফুলী ও বঙ্গোপসাগরের মিলনকেন্দ্র মোহনার সৌন্দর্য উপভোগের মজাই আলাদা।কাঠগড় বাজার থেকে একটু এগিয়ে গেলেই সমুদ্র সৈকতে যাওয়ার রাস্তা ঘিরে আছে সবুজে ছাওয়া ঝাউবন দিয়ে। সারি সারি সবুজ ঝাউগাছ প্রাচীরের মতো মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। আর মনের আনন্দে হেলেদুলে আগত পর্যটকদের গায়ে শীতল বাতাসের স্পর্শ বুলিয়ে দিচ্ছে। সমুদ্র সৈকত এলাকায় সাগরের কূল ঘেঁষে ৭-৮ বছর আগে বন্যার হাত থেকে রক্ষা করতে নির্মাণ করা হয়েছিল বেড়িবাঁধ। বাঁধ রক্ষার জন্য এলোমেলোভাবে ফেলে রাখা সিমেন্টের বানানো বড় স্তূপ বেড়িবাঁধের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করেছে এবং পর্যটকদের বসার সুবিধা হয়েছে। বাঁধ পেরিয়েই রয়েছে সমুদ্রের কূল ঘেঁষে বালুকা বেলায় ডেকোরেশনের চেয়ার-টেবিল পেতে খাবার হোটেল, শামুক-ঝিনুকের তৈরী সৌখিন জিনিসপত্র ও গহনার পসরাসাজিয়ে বসে আছে শত শত দোকান। ছুটির দিনগুলোতে প্রচণ্ড ভিড় থাকে। আর ঈদ মৌসুম হলে তো কথাই নেই। পর্যটকরা ঘুরে বেড়িয়ে, কেনাকাটা করে সময় কাটান। বিকেলে সমুদ্রের বুকে সূর্যাস্তের মনোরম দৃশ্য দেখার জন্য সব বয়সের মানুষ ভিড় জমান।ধীরে ধীরে সোনালী সূর্য সমুদ্রের বুকে বিলীন হয়ে যায় চারদিকে রক্তিম আভা ছড়িয়ে দিয়ে। ক্রমে চারদিকে আঁধার ঘনীভূত হতে থাকে। দর্শনার্থীরা তৃপ্তি আর প্রাপ্তির সুখে উল্লাসিত হয়ে ঘরে ফেরেন। রাতের চোখে ঘুম নেমে আসে। আবার রাতের কোলে আসমানে চাঁদ ঘুমায়। আর তাই দেখে আকাশে হেলান দিয়ে হাজারও জমানো কথা বুকে নিয়ে মৌন হয়ে পাহাড় ঘুমায়। অনিন্দ্য সুন্দর রাতের এ নীরব মাধুর্য দেখে সৌন্দর্যপিপাসুদের চোখেও এক সময় ঘুম নেমে আসে। আবার রাতের প্রকৃতির এ নীরব সৌন্দর্য কারও চোখের ঘুম কেড়ে নেয়।

 

 

লেখক : কবি ও সাংবাদিক।
দৈনিক ইনকিলাব

Facebook Comments

বাংলাদেশ সময়: ৪:৩৬ অপরাহ্ণ | রবিবার, ০৩ অক্টোবর ২০২১

জাপানের প্রথম অনলাইন বাংলা পত্রিকা |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

জাপানের পথে পথে  (পর্ব-১)

১১ জানুয়ারি ২০২১