ঘোষণা

জাপানের পথে পথে ( পর্ব – ১০) আই- আই গাছা বা ভালোবাসার ছাতা

সাইম রানা | রবিবার, ০৬ জুন ২০২১ | পড়া হয়েছে 82 বার

জাপানের পথে পথে ( পর্ব – ১০) আই- আই গাছা বা ভালোবাসার ছাতা
 আই-আই গাছা বা এক ছাতায় দুই মাথা সাইম রানা আজ ১৩ জুন ২০০৫, বাসায় একা। সকাল থেকে ঘরের ভিতরে জাপানিজ ভাষা শিখতে শিখতে ক্লান্ত লাগছে। ছোটবেলা বইতে পড়েছিলাম চীন জাপানের শিশুরা ছোট ছোট জুতা পরে তাদের পা ছোট রাখে। তারা ফুলের নকশা করা পোশাক পরে, নানা রং ও নকশা করা ঘুড়ি উড়ায়। আজ বিকেলে সেইসব দৃশ্য দেখার সুযোগ মেলে কি না, তা নিয়ে ভাবছিলাম। আমার ঘরের পাশের ঘরটি কিয়োকোর ব্যক্তিগত লাইব্রেরি। সেখান থেকে একটি পকেট সাইজের ইংরেজি বই পছন্দ হল জাপানিজ সংস্কৃতি ও প্রথা বিষয়ক। ঐতিহ্য বিষয়ে ছোট ছোট রচনায় ঠাসা। শুয়ে শুয়ে পাতা উলটচ্ছি, দেখছি সিনতো মন্দিরে কাঠের টুকরোয় আশা ও ইচ্ছেগুলো লিখে রাখার রীতি, সম্রাটের প্রাসাদে রাজকন্যাদের বিলাসিতার গল্প, গেইশাদের প্রেম, চা পরিবেশনের নিয়ম, সামুরাইদের আভিজাত্য ও সাহসিকতার বর্ণনা ইত্যাদি। হঠাৎ একটি লেখায় চোখ আটকে গেল, এর শিরোনাম ‘আই-আই গাছা’। গাছা বা কাছা মানে ছাতা, এবং আই মানে ভালবাসা। অর্থাৎ ভালবাসার ছাতা। একথা না বললেই নয় যে, এই বস্তুটি জাপানিজদের জীবনে পোশাকের মতোই অনিবার্য। এই রোদ এই বৃষ্টির দেশ জাপান মূলত চার ঋতুর দেশ, কিন্তু প্রতি ঋতুতেই বৃষ্টি হতে পারে এবং তা অকস্মাৎ। এই দেখা যাচ্ছে মেঘহীন সুনীল রৌদ্রকরোজ্জল আকাশ, ঠিক পাঁচ মিনিট পরই নেমে যেতে পারে মুশলধারায় বৃষ্টি। আবার আপনি গরমে ঘামছেন, কিছুক্ষণ পরই উড়ে আসতে পারে কনকনে শীতার্ত বাতাস। ফলে ছাতা বা রেইন কোট, এমনকি শীতের পোশাক নিয়ে বের হওয়াটাই নিরাপদ। যাই হোক ছাতা নিয়ে গাথা পড়তে গিয়ে দেখি এ নিয়ে এক মহা-সংস্কার রয়ে গেছে। ফলে তাদের জনপ্রিয় কার্টুন সিরিজ, আনিমে বা এনিমেশনে, চলচ্চিত্র, নাটক-নৃত্য সব ক্ষেত্রেই ছাতার প্রতীকায়ন করা হয়ে থাকে, বিশেষত্ব নারীপুরুষের প্রেম-প্রণয়কে উদ্দেশ্য করে। প্রেমিক-প্রেমিকার গোপন মনোভাব বা মানসিক প্রভাব ছাতা ব্যবহারের মাধ্যমেও প্রতিফলিত হয়। যেমন তরুণ-তরুণী যুগল যদি একটি ছাতার নিচে ঘনিষ্ঠ অবস্থায় হেঁটে যায় তাহলে জানতে হবে তাদের মধ্যে প্রেম আছে। আমাদের দেশেও এরকম কিছু রীতি আছে, একটি রিকশায় যদি প্রেমিকযুগল ওঠে, সেখানে মেয়েটি ছেলের বাম দিকে বসে, আর না বসলে ধরে নেয়া হয় তারা প্রেমিক-প্রেমিকা নয়। সে সূত্রে, একটি ছাতা ব্যবহারের ক্ষেত্রে দুজনের মধ্যে বিপরীত লিঙ্গের না হলে ধরে নিতে হবে তারা দুজন মিলে একটি গবেষণা, বা গুরুত্বপূর্ণ কাজ করছে, এক্ষেত্রে মনে করার কারণ নেই যে তারা সমকামী। এই প্রতীকী ব্যপার তৃতীয়পক্ষের কৌতূহল কিংবা জ্বালাতন করার জন্যেও ব্যবহৃত হতে পারে, আমাদের দেশে যেমন স্কুল কলেজের ছেলেমেয়েরা কারুর সম্পর্ক নিয়ে বিরক্ত করার জন্য স্কুলের বেঞ্চে বা দেয়ালে, টয়লেটে যোগ চিহ্ন দিয়ে দুজনের নাম লিখে রাখতে দেখা যায়, জাপানিজ ছেলে-মেয়েরাও একই ঘটনা ঘটায়, তবে তা একটি ছাতার নিচে যুগলের নাম লিখে তাদের প্রেম বিষয়ে সন্দেহ বা উপহাস করতে দেখা যায়। যদি ছেলে-মেয়ের মধ্যে প্রেম না হয়ে শুধুমাত্র বন্ধুত্ব থাকে তাহলে তারা কখনোই এক ছাতার নীচে আসবে না, অবশ্য তুমুল বৃষ্টি বা বিপদজনক মুহূর্তের কথা আলাদা। আবার এই ধরনের পরিস্থিতির সুযোগও কেউ কেউ নিয়ে নিতে পারে, যেমন কোন ছেলে তার পছন্দের মেয়েটিকে প্রেমের প্রস্তাব দিতে গিয়েও পেরে ওঠে না, তখন সে একটি বিপদ মুহূর্তে সুযোগ গ্রহণের চেষ্টা চালায় বা একটি তুমুল বৃষ্টিপাতের জন্য অপেক্ষা করে, যেখানে দুজন অবস্থান করবে কিন্তু তাদের কাছে মাত্র একটিই ছাতা। বাধ্য হয়ে একই ছাতার নীচে হাঁটলে তারা রোমান্টিক প্রতীকের প্রথায় অনেকটা আটকে যায়।
ইউরোপে যেমন প্রেম নিবেদনের ক্ষেত্রে চুমু দেয়া বা আলিঙ্গন করার প্রথা রয়েছে, এব্যাপারে জাপানিজরা অনেক লাজুক প্রকৃতির, ফলে একটি ছাতার নীচে তারা কতোটা কাছাকাছি বা ঘেঁষে হাঁটলো, তা দেখেই অনুমান করা যায় তাদের সম্পর্কের ধরন কোন পর্যায়ে। তবে অনেক বয়সের ব্যবধানের দুজন একসাথে যেতে পারে, এটা উপকারের মধ্যেই পড়ে। আবার বয়সে ছোটরা বিপদ মুহূর্তেও প্রয়োজনে ভিজে যাবে, তবুও এক ছাতার নীচে আসে না অন্যের দেখে ফেলার ভয়ে। আর যদি একসাথে যায়ও, এবং তাদের মধ্যে প্রেম নাও থাকে, তবে ওই দিনটি অন্তত বিশেষ দিন হিসেবে মনে রাখতে পারে, পরের বছর ওই দিনের স্মৃতি স্বরূপ উপহারও পাঠাতে পারে। জাপানিজদের একটি কমন অভ্যাস হল বাইরে বেরুনোর আগে আবহাওয়ার খবরটি জেনে নেয়া। এছাড়া প্রত্যেক বাসাবাড়ি, অফিসের প্রবেশদ্বারে ছাতা রাখার একটা বাক্স থাকে, অকস্মাৎ বিপদে একজনের ছাতা অন্যজন বিনা অনুমতিতেও নিয়ে যেতে পারে। তবে নিজের মনে করে মেরে দেয়ার ইচ্ছে থাকে না কারুর। যদিও বর্তমানে এসব ব্যাপার অনেকটা শিথিল হয়ে গেছে আধুনিকতার স্পর্শে, এখন তারা প্রেমের ক্ষেত্রে অনেকে ইউরোপীয় স্টাইলকেও হার মানায়। মেট্রোতে বাসে আলিঙ্গনাবদ্ধ অজস্র যুগলের দেখা মিলবে। তবে সাহিত্য ও মাঙ্গা কার্টুনে এবং এনিমেশনে এখনো ঐতিহ্যের স্মারক হিসেবে রোমান্টিক অনুভুতির প্রতীক হিসেবে টিকে আছে। অন্যদিকে, বিবাহিতরা হয়তো দুজন দুটি ছাতা নিয়েই চলে, কারণ তাদের প্রণয় ও ঘনিষ্ঠতা ইতিমধ্যে হয়ে গেছে, কিন্তু তাদের সন্তানরা বাবা-মায়ের প্রেমের বন্ধনের স্মারক হিসেবে ছাতা এঁকে উপহার দেয়ার রীতি এখনো রয়ে গেছে । অর্থাৎ জাপানিজদের জীবনের সাথে এই বস্তুটি প্রতিটি পরতে পরতে মিশে আছে, যদিও বর্তমানে অধিকাংশ নারীপুরুষ এই প্রথাকে খুব একটা গুরুত্ব দিতে চায় না। তারা মনে করে দুর্যোগ মুহূর্তে একই ছাতার তলে ঘনিষ্ঠ হয়ে যাওয়াটা প্রেম বা প্রতীক না হয়ে বরং মানবিকতার প্রতীক হওয়া উচিৎ, বিপদগ্রস্থকে বৃষ্টিতে ভিজিয়ে নিজে একটি ছাতা নিয়ে যাওয়া কোন প্রথা হওয়াটাও ঠিক নয়। আমি এইসব পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। ঘুম ভেঙে গেলে দেখি গোধূলির লাল আভা জানালার পর্দায় এসে লেগেছে। বাইরে বেরুনোর জন্য প্রস্তুত হলাম। ভাবছিলাম এমন দৃশ্যও দেখার সৌভাগ্য হবে কি না। সেইদিন রঙিন বিকেলে কোন বৃষ্টির আভাস ছিল না, তবুও সাথে একটি ছাতা নিতে ভুল করি নাই। (চলবে)
লেখক একসময় জাপান প্রবাসী ছিলেন,
বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং সঙ্গীত বিশেষজ্ঞ।
Facebook Comments

বাংলাদেশ সময়: ৫:২৭ অপরাহ্ণ | রবিবার, ০৬ জুন ২০২১

জাপানের প্রথম অনলাইন বাংলা পত্রিকা |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

জাপানের পথে পথে  (পর্ব-১)

১১ জানুয়ারি ২০২১