ঘোষণা

জাপানের পথে পথে পর্ব-১১ গানের পাখি কালাভিঙ্কা দেবতা

সাইম রানা | শনিবার, ৩১ জুলাই ২০২১ | পড়া হয়েছে 107 বার

জাপানের পথে পথে পর্ব-১১ গানের পাখি কালাভিঙ্কা দেবতা

 

১৪ জুন ২০০৫, মঙ্গলবার। আজ আমার প্রথম নিজ চেষ্টায় আই- ও-ইন টেম্পলে অর্থাৎ ক্যারিওবিঙ্গা বুদ্ধিস্ট রিসার্চ ইন্সিটিউট-এ ক্লাস। সেতাগায়া থেকে প্রথমে ইকেবুকুরো স্টেশনে গেলাম, সেখান থেকে কামি ইতাবাসি স্টেশন । প্রথম দিন অর্থাৎ ১১ তারিখে প্রফেসরের সাথে প্রাইভেট কারে এসেছিলাম এখানে । ফলে শহরের অলিগলি কিছুই বুঝে উঠতে পারিনি । আজ স্বাধীনভাবে চলছি, শহরের ঘরবাড়ি, পুরোনো দালান, মহল্লা, সিনেমা হল, ট্রাফিকজ্যাম, মার্কেট, ভিক্ষুক, ছোট ছোট নদী ঝর্ণা কোনকিছুই দৃষ্টি এড়িয়ে যাচ্ছে না ট্রেনের জানালা থেকে। স্টেশন থেকে নেমে পনের মিনিট পায়ে হেঁটে টেম্পলে পৌঁছুতে হয়। রাস্তার এক পাশে পুকুর, সেখানে নুইয়ে পড়েছে চেরি ও অন্যান্য লতাগুল্ম; অন্যপাশে পাইন ও মেপলের বন। মাঝে মাঝে পাথরের দেয়ালে ঘেরা দু’একটি কাঠের ঘর।


টেম্পলে আজ আরও কিছু প্রাচীন বৌদ্ধস্তোত্রের ছোট ছোট বই ধরিয়ে দেয়া হল। করোগেট ভাঁজের একটি লম্বা পাতা। আমি হিরাই সানের কাছে জানতে চাইলাম ক্যারিয়ওবিঙ্গা অর্থ কি? তিনি বললেন চীনদেশের একধরনের সুরেলা পাখি। পরবর্তীতে শব্দটি নিয়ে ঘাটতে ঘাটতে বেরিয়ে এলো মজার সব পৌরাণিক তথ্য। হিরাই সান ঠিকই বলেছিলেন যে ক্যারিওবিঙ্গা এক ধরনের পাখি, যে সংগীত ও নৃত্য করতে করতে বাতাসে উড়ে চলে।কিন্তু চরিত্রটি মূলত ভারতীয় পৌরাণিক দেবতা যিনি ‘কালভিঙ্কা’ নামে পরিচিত। সে নানা রূপ ধারণ করতে পারে, বৈদিক দেবতা গরুড়কে সহযোগিতা করে। পরবর্তীতে এই চরিত্র বৌদ্ধধর্মেও অভিযোজিত হয়েছে। এখানে বুদ্ধ দেবতা আমিদা নিয়ওরাই-এরও সহযোগী। অসুরদের কল্যাণ কামনার জন্য দেবরাজ ইন্দ্র একদা ক্রুদ্ধ হয়ে বিশ্বরূপাচার্যকে শিরশ্ছেদ করে তিন টুকরো করেছিলেন। সেই তিনটি অংশ থেকে যথাক্রমে কালাভিঙ্কা, কাপিঙ্গালা এবং তিতিরি নামের তিন ধরনের পাখি সৃষ্টি হয়েছিলো ।ক্যারিওবিঙ্গা তাদেরই একজন।


জাপানিজ বৌদ্ধধর্মে বৈদিক দেবতাদের বিচরণ নানাভাবে রয়েছে। ক্যারিওবিঙ্গা যে গরুড় বা কারুর দেবতারও সহযোগী সেকথাও জানা গেল। মজার ব্যাপার হল শিশুদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় কার্টুন সিরিজ পকেমন তৈরি করা হয়েছে। এই পকেমন গরুড় দেবতারই প্রতিরূপ ধরা যেতে পারে, সেখানে ক্যারিওবিঙ্গার উপস্থিতি রয়েছে। এছাড়াও ক্যারিয়বিঙ্গার ভাস্কর্য, মুরাল, ডাকটিকেট, বইয়ের তিলক, সুভেনিয়র প্রভৃতিতে ব্যবহৃত হতে দেখা যায়। এই দেবতার নামেই গবেষণা প্রতিষ্ঠান।
বিকেল চারটায় ক্লাস শুরু হল। চার ঘণ্টার মাঝে দুইবার বিরতি, একবার হালকা নাস্তা, তাতে পেস্ট্রি কেক, একধরনের ফল এবং সবুজ চা তো আছেই। মাঝামাঝি সময়ে এলো নৈশভোজন। কাঠের বাক্সের ভিতরে ভাত এবং তার উপর লম্বা একটি আধাসেদ্ধ চিংড়িমাছ। মিষ্টি মাখানো আঠালো ঝোল, যা ভ্রাম্যমাণদের জন্য অভিজাত খাবার ।

ক্লাসের গবেষক বন্ধুদের সাথে শিক্ষক মিঃ কাসু কেন পরিচয় করিয়ে দিলেন, প্রায় পঁচিশজন সকলের সাথে সহাস্য দৃষ্টি বিনিময় হল। প্রত্যেকেই পুরহিত। জাপানের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে তারা এখানে আসেন। এদের অধিকাংশই তরুণ হলেও টেম্পলের দায়িত্ব প্রাপ্তির পেছনে অধিকাংশেরই বংশ পারম্পর্য রয়েছে। সাইতো সেতসুজিও আমাকে জাপানিজ মিউজিক্যাল নোটেশন ভাল ভাবে বুঝিয়ে দিলো। মূলত পেনটাটনিক বা ঔড়ব স্বরের হলেও স্বর ব্যবহারের ভিন্নতা রয়েছে, ডি নোটকে গ্রহস্বর ধরা হয়। চাইনিজ সাংকেতিক স্বরলিপি অতি প্রাচীন। ঐতিহাসিকভাবে সত্য যে জাপানিজদের সর্বকালের মহান শিক্ষক কুকাই ৮০৪ সালে চিনের ইউসান টেম্পল থেকে সংগ্রহ করেছিলেন।

এই পাণ্ডুলিপির সুর আরও দুইতিনশত বছর আগে চীনের স্কলারগণ ভারত থেকে সংগ্রহ করেছিলেন, এগুলোকে সংস্কৃত স্তোত্র ‘সোমিও’ বা বাংলায় ‘সৌম্য’ নামে পরিচিত। বাংলার চর্যাগীতি ও দোঁহাকোষ এর সমসাময়িক কিংবা আন্তসম্পর্কীয়। কারো কারো মতে সৌম্য সংগীত ও চর্যা একই সংগীত। যাই হোক চীন ও জাপানের মানবসম্পদের আধ্যাত্মিক উন্নয়নে, সুশৃঙ্খল সাম্রাজ্যগঠন, ক্ষুরধারসম্পন্ন সামুরাই যোদ্ধাগোষ্ঠী গঠনে এইসব সঙ্গীত সাধনার যোগ রয়েছে। জাপানিজদের মেধা, স্থিরতা ও বিনম্রতার পেছনে ভারতীয় শিক্ষার অশেষ দান রয়েছে—তবে তা আত্মীকরণের কৃতিত্ব স্বয়ং তাদের।

 

লেখক একসময় জাপান প্রবাসী ছিলেন,
বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং সঙ্গীত বিশেষজ্ঞ।

Facebook Comments

বাংলাদেশ সময়: ৭:০০ অপরাহ্ণ | শনিবার, ৩১ জুলাই ২০২১

জাপানের প্রথম অনলাইন বাংলা পত্রিকা |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

জাপানের পথে পথে  (পর্ব-১)

১১ জানুয়ারি ২০২১