ঢাকা, ১২ এপ্রিল ২০২৬ — মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় বাংলাদেশে এক নজিরবিহীন সংকট তৈরি হয়েছে। আমদানিনির্ভর জ্বালানি নীতি এবং ডলার সংকটের কারণে একদিকে যেমন লোডশেডিং বেড়েছে, অন্যদিকে শিল্প ও পরিবহন খাতে গ্যাসের অভাবে স্থবিরতা নেমে এসেছে।
বিদ্যুৎ পরিস্থিতি: শহর বনাম গ্রাম
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (BPDB) এর তথ্যমতে, বর্তমানে দেশে বিদ্যুতের দৈনিক চাহিদা প্রায় ১৫,৯০০ মেগাওয়াট, কিন্তু সর্বোচ্চ উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে মাত্র ১৪,৯৫০ মেগাওয়াট। এই ১,০০০ মেগাওয়াটের বেশি ঘাটতির ফলে:
-
গ্রামাঞ্চল: পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (REB) জানিয়েছে, অনেক এলাকায় দৈনিক ৫ থেকে ৬ ঘণ্টা লোডশেডিং করতে হচ্ছে।
-
শহর: ঢাকা ও চট্টগ্রামের মতো বড় শহরগুলোতে লোডশেডিংয়ের মাত্রা কম হলেও শিল্পাঞ্চলে নিয়মিত বিদ্যুৎ বিভ্রাট ঘটছে।
জ্বালানি ও গ্যাস সংকট: শিল্পের চাকা থমকে যাওয়ার পথে
জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে গ্যাসের সরবরাহ চাহিদার তুলনায় প্রায় ৪০% কম। ১. গার্মেন্টস ও টেক্সটাইল: বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান জানিয়েছেন, পর্যাপ্ত গ্যাস ও বিদ্যুৎ না থাকায় কারখানাগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা ৩০% কমে গেছে। ডিজেল দিয়ে জেনারেটর চালানোও খরচসাপেক্ষ হয়ে পড়েছে। ২. সার কারখানা: দেশের ৫টি বড় সার কারখানার মধ্যে ৪টিই বর্তমানে গ্যাস স্বল্পতার কারণে বন্ধ রয়েছে। এতে আগামী মৌসুমে সারের তীব্র ঘাটতি ও খাদ্য নিরাপত্তার ঝুঁকির আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। ৩. পরিবহন: সিএনজি স্টেশনগুলোতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার পরেও অনেক চালক গ্যাস পাচ্ছেন না। জ্বালানি তেলের অনিয়মিত আমদানির ফলে লঞ্চ ও বাস ভাড়াও বেড়েছে।
| খাত | সংকটের স্বরূপ | দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব |
| বিদ্যুৎ | ১,৫০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত ঘাটতি | শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ও সেচ কাজে বিঘ্ন। |
| গ্যাস | দৈনিক ১,৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট ঘাটতি | শিল্প উৎপাদন হ্রাস ও সারের অভাব। |
| জ্বালানি তেল | আমদানিতে ডলারের টান | পরিবহন খরচ ও মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি। |
| অর্থনীতি | ২ বিলিয়ন ডলারের অতিরিক্ত চাপ | বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ সৃষ্টি। |
সরকারের পদক্ষেপ ও জনদুর্ভোগ
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানিয়েছেন, সরকার কৃষিকাজে ও সেচ মৌসুমে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে। বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে ইতোমধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সাময়িক বন্ধ রাখা এবং রাত ৯টার পর বিপণিবিতান বন্ধের মতো কঠোর কৃচ্ছ্রসাধন নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। এছাড়া, জ্বালানি তেলের সুষম বণ্টনের জন্য ‘ফুয়েল পাস’ (Fuel Pass) নামক মোবাইল অ্যাপের পরীক্ষামূলক ব্যবহার শুরু হয়েছে।
“আমরা বর্তমানে একটি বৈশ্বিক জ্বালানি যুদ্ধের শিকার। দেশের নিজস্ব গ্যাস উত্তোলনে দীর্ঘদিনের অবহেলা এখন আমাদের আমদানিনির্ভর করে তুলেছে, যার মাসুল সাধারণ জনগণকে দিতে হচ্ছে।” — জ্বালানি বিশেষজ্ঞগণ।
ভবিষ্যৎ পূর্বাভাস
আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলার অতিক্রম করায় বাংলাদেশের আমদানি বিল অন্তত ৪০% বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দ্রুত নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার এবং নিজস্ব খনি থেকে গ্যাস উত্তোলন শুরু করতে না পারলে ২০২৬ সাল জুড়েই এই অস্থিরতা বজায় থাকতে পারে।
সূত্র: বিপিডিবি দৈনিক প্রতিবেদন, পেট্রোবাংলা ও আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা।